শহুরে জীবনের ছায়ায় শিশুদের শরীরে নীরবে জমছে এক বড় বিপদ। উচ্চরক্তচাপ, যা একসময় প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা বলে ধরা হতো, এখন শিশু ও কিশোরদের মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতের হৃদ্রোগ, কিডনি সমস্যা ও বিপাক জনিত জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে উনিশ বছর বা তার কম বয়সী শিশু ও কিশোরদের মধ্যে উচ্চরক্তচাপের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি সব অঞ্চলেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক হতে পারে।
শিশুদের উচ্চ রক্তচাপ কেন আলাদা
শিশুদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের চরিত্র প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে আলাদা। প্রাপ্তবয়স্কদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্পষ্ট কারণ না থাকলেও শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায়ই শরীরের ভেতরে অন্য কোনো সমস্যার যোগ থাকে। কিডনি, হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী গ্রন্থি কিংবা রক্তনালির ত্রুটি অনেক সময় এই সমস্যার পেছনে কাজ করে। তাই শিশুদের রক্তচাপ বেড়ে গেলে শুধুই জীবনযাপনের দিকটি না দেখে বিস্তারিত চিকিৎসা পরীক্ষা জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।

শহুরে জীবন যাপন ও ঝুঁকির কারণ
দ্রুত নগরায়ণকে এই সমস্যার বড় চালক হিসেবে দেখছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা। শহরে বেড়ে ওঠা শিশুদের খাদ্যতালিকায় প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার বাড়ছে। খেলাধুলা কমে গিয়ে পর্দার সামনে সময় বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ। নিরাপদ খেলার জায়গা ও স্বাস্থ্যকর খাবারের সহজ প্রাপ্যতা না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে, বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে।
শরীরের ওজন ও ভবিষ্যৎ জটিলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের অতিরিক্ত ওজনই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। অতিরিক্ত চর্বি শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং রক্তনালীর উপর চাপ বাড়ায়। এর ফল হিসেবে হৃদযন্ত্রকে বেশি কাজ করতে হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলে করোনারি হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক সময় রক্তনালির ক্ষতি স্থায়ী রূপ নিতে পারে।

সঠিক পরীক্ষা ও আগাম শনাক্তকরণ
শিশুদের রক্তচাপ মাপার ক্ষেত্রে বয়স ও শারীরিক গঠনের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি। ভুল মাপজোক বা প্রাপ্তবয়স্কদের যন্ত্র ব্যবহার করলে ভুল নির্ণয়ের আশঙ্কা থাকে। এই কারণে স্কুল ভিত্তিক স্বাস্থ্য পরীক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়মিত পরীক্ষা হলে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব, আর তখনই খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন বা প্রয়োজনে চিকিৎসা শুরু করা যায়।
চিকিৎসকদের অভিমত, শিশুদের উচ্চরক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দেরি করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় মূল্য দিতে হবে। তাই সচেতনতা ও আগাম উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















