সময়ের তীব্র মেরুকরণের ভেতর গত এক বছরে চলচ্চিত্র, মঞ্চনাটক ও ধারাবাহিক নাটক যেন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। বর্ণবৈষম্য আর ন্যায়ের প্রশ্নে সবচেয়ে কার্যকর দৃষ্টিকোণটি মাঝামাঝি রাজনীতির জায়গা থেকেই উঠে আসছে। দর্শকসংখ্যা ও সমালোচনার সাফল্যে এগিয়ে থাকা কয়েকটি কাজ সেই কথাই বলছে। সমতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এসব গল্পে শ্বেত উদারপন্থী চরিত্ররা কখনও দ্বিধাগ্রস্ত, কখনও আবার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকেই বসিয়ে দেয়। তবু হতাশা নয়, বরং সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তিই এখানে প্রধান সুর।
মঞ্চে করুণার জন্ম, ন্যায়ের মৃত্যু
ব্রডওয়ের পুনরুজ্জীবিত সংগীতনাট্য র্যাগটাইম-এ কৃষ্ণাঙ্গ পিয়ানোবাদক থেকে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা কোলহাউস ওয়াকার জুনিয়রের উপস্থিতি আগের সব রূপের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। তবু সবচেয়ে বড় রূপান্তর ঘটে এক শ্বেত ধনী ব্যবসায়ীর মধ্যে, যিনি সময়ের সামাজিক বদলকে অস্বীকার করেন। মঞ্চে কৃষ্ণাঙ্গ যন্ত্রণা তাকে বদলাতে বাধ্য করে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে সারার মৃত্যু, পরে সমঝোতার পর কোলহাউসের হত্যাই তার বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। দর্শকসারিতে অশ্রু আর নীরবতা জমে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, বহুজাতিক আশাবাদের মুহূর্তে কেন সারাও নেই, কোলহাউসও নেই।

এই অনুপস্থিতিই মনে করিয়ে দেয়, সমতার বয়ানে কৃষ্ণাঙ্গ ত্যাগ কতটা স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। গল্পের শেষে একটি শিশুকে ঘিরে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন আঁকা হয়, কিন্তু সেই স্বপ্নের দাম কি অতিরিক্ত রক্ত?
বিপ্লবের ভার কার কাঁধে
পল থমাস অ্যান্ডারসনের চলচ্চিত্র ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার-এ হতাশ শ্বেত সাবেক বিপ্লবী প্যাট ক্যালহাউনের অসহায়ত্বই কাহিনির চালিকাশক্তি। কৃষ্ণাঙ্গ মা হারিয়ে যাওয়া কিশোরী মেয়েটিকে বড় করার লড়াইয়ে তিনি নিজেই হারিয়ে যান। বিপ্লবী স্লোগান তার মুখে শোনা গেলেও কাজে তার ছাপ নেই। শেষ পর্যন্ত মেয়েটিকেই একা পথ খুঁজে নিতে হয়। এখানে শ্বেত উদারতার সদিচ্ছা আছে, কিন্তু পাশে দাঁড়ানোর দায় নেই।
সমতার প্রলোভন ও দখলের রাজনীতি

রায়ান কুগলারের সিনারস আমাদের ফিরিয়ে নেয় ত্রিশের দশকে। মিসিসিপির ডেল্টায় কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্নে থাকা দুই ভাইয়ের সামনে প্রথমে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী হুমকি। পরে দেখা যায়, আসল বিপদ এক ভ্যাম্পায়ারের ছদ্মবেশে আসা সংগীতপিপাসু শ্বেত চরিত্র। সে বহুজাতিক ঐক্যের গান শোনায়, কিন্তু সেই ঐক্য বাস্তবায়নের শর্ত একটাই—সবাইকে তার মতো হতে হবে। সমতা এখানে দখলের হাতিয়ার, মুক্তির পথ নয়।
ভালো ইচ্ছার বিপদ
ধারাবাহিক নাটক দ্য লোডাউন-এ এক শ্বেত নাগরিক সাংবাদিক দুর্নীতি উন্মোচনের নেশায় নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখে। তার সদিচ্ছা বারবার বিপদ ডেকে আনে রঙিন মানুষের জীবনে। ভুল স্বীকার আর দায়িত্ব ভাগাভাগির মধ্য দিয়েই কেবল আংশিক মীমাংসার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবু এখানেও সতর্কতা স্পষ্ট। ন্যায়ের পথে শ্বেত মিত্রতার মূল্য যদি অন্যের ক্ষতই হয়, তবে সেই মিত্রতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

শেষ কথা
এই সব গল্প একসঙ্গে বলে দেয়, বর্ণগত ন্যায়ের লড়াইয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি প্রতিপক্ষ কে, তা নয়; বরং প্রকৃত বন্ধু কে, সেটাই। সমতা তখনই অর্থবহ, যখন তা আত্মকেন্দ্রিকতা ছাড়িয়ে পাশে দাঁড়ানোর দায় নেয়।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















