০৫:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণা: হৃদরোগ থেকে মেনোপজ পর্যন্ত যে সত্যগুলো জানা জরুরি বিচ্ছেদের সবচেয়ে কঠিন সত্য জানালেন জেনিফার গার্নার বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ২০২৬ সালের ইতিবাচক সূচনা ইরানে বিক্ষোভে গুলি, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন আরও তীব্র আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় তীব্র বোমাবর্ষণ, তিন দিনে নিহত অন্তত সতেরো গত ১৬ মাসে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার আমি: আসিফ নজরুল ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো সহজ নয়: অর্থ উপদেষ্টা গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে যুক্ত হতে আগ্রহ জানাল বাংলাদেশ ‘আওয়ামীপন্থী’ শিক্ষককে টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর অফিসে নিলেন চাকসু নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ

পৃথিবীর সবচেয়ে দূষণকারী তেলভাণ্ডার ভেনেজুয়েলা

ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলভাণ্ডার। কিন্তু সেই বিপুল সম্পদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভয়াবহ দূষণ, জলবায়ু ঝুঁকি আর পরিবেশ ধ্বংসের দীর্ঘ ছায়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল শুধু পরিমাণে নয়, দূষণের দিক থেকেও বিশ্বের শীর্ষে।

ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেলের মজুত প্রায় তিনশ বিলিয়ন ব্যারেল বলে ধারণা করা হয়। এই তেলের বড় অংশই অত্যন্ত ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ, যা উত্তোলন ও পরিশোধনে বিপুল শক্তি লাগে। ফলে সাধারণ তেলের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হয়। একসময় দেশটি দিনে সাড়ে তিন মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। অর্থনৈতিক সংকটের পর সেই উৎপাদন নেমে এসেছে এক মিলিয়নেরও নিচে।

অতিভারী তেলের জটিল বাস্তবতা

ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ তেল পাওয়া যায় ওরিনোকো অঞ্চলে। এই তেল এতটাই ঘন ও আঠালো যে সাধারণ প্রযুক্তিতে উত্তোলন কঠিন। উত্তোলনের জন্য বাষ্প প্রবেশ করানোর মতো জটিল প্রযুক্তি দরকার হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর জ্বালানি পোড়াতে হয়, ফলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ দ্রুত বাড়ে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের তেল উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ানোর বড় উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

ভয়াবহ গ্যাস পোড়ানো ও মিথেন নিঃসরণ

তেল শোধনাগারে গ্যাস পোড়ানো ভেনেজুয়েলায় বহুদিনের চর্চা। তবে অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তেল উত্তোলনের সময় বের হওয়া প্রাকৃতিক গ্যাস সংরক্ষণ না করে আগুনে পোড়ানো হচ্ছে। এর ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিপুল পরিমাণ মিথেন, যা স্বল্পমেয়াদে কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে বহু গুণ বেশি তাপ ধরে রাখে।

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গ্যাস পোড়ানো দেশগুলোর তালিকায় ভেনেজুয়েলা শীর্ষে উঠে এসেছে। এক বছরে দেশটি তার উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় অর্ধেকই আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে। জলবায়ু বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই হার অবিশ্বাস্যরকম বেশি এবং এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

তেল ছড়িয়ে পরিবেশ বিপর্যয়

দুর্বল হয়ে পড়া তেল খাত ভেনেজুয়েলাকে আরও বড় পরিবেশগত সংকটে ফেলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছরে দেশটিতে হাজার হাজার তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে এই তথ্য প্রকাশ বন্ধ হলেও গবেষকেরা নিয়মিত নতুন দূষণের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় উপকূলীয় জলাভূমি, প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক প্রাণী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

অনেক তেল স্থাপনা সংরক্ষিত বন ও জলাধারের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে তেল ছড়িয়ে পড়লে পানীয় জলের উৎস দূষিত হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন।

বন উজাড় ও অবৈধ খনির বিস্তার

তেল আয়ের পতনের পর সরকার সোনার খনির দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু এই খনির বড় অংশই অবৈধ এবং পরিবেশগত নিয়ম উপেক্ষা করে চলছে। ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। কয়েক বছরে লাখ লাখ একর প্রাথমিক বন ধ্বংস হয়ে গেছে বলে পরিবেশ পর্যবেক্ষকদের হিসাব।

এই খনিতে ব্যবহৃত পারদসহ বিষাক্ত রাসায়নিক নদীতে মিশে মাছ ও পানির উৎস দূষিত করছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ দেশটির জন্য সম্ভাবনার পাশাপাশি এক গভীর সংকটও বয়ে এনেছে। যথাযথ বিনিয়োগ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সম্পদ ভবিষ্যতে জলবায়ু ও প্রকৃতির জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণা: হৃদরোগ থেকে মেনোপজ পর্যন্ত যে সত্যগুলো জানা জরুরি

পৃথিবীর সবচেয়ে দূষণকারী তেলভাণ্ডার ভেনেজুয়েলা

০১:২৫:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলভাণ্ডার। কিন্তু সেই বিপুল সম্পদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভয়াবহ দূষণ, জলবায়ু ঝুঁকি আর পরিবেশ ধ্বংসের দীর্ঘ ছায়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল শুধু পরিমাণে নয়, দূষণের দিক থেকেও বিশ্বের শীর্ষে।

ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেলের মজুত প্রায় তিনশ বিলিয়ন ব্যারেল বলে ধারণা করা হয়। এই তেলের বড় অংশই অত্যন্ত ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ, যা উত্তোলন ও পরিশোধনে বিপুল শক্তি লাগে। ফলে সাধারণ তেলের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হয়। একসময় দেশটি দিনে সাড়ে তিন মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। অর্থনৈতিক সংকটের পর সেই উৎপাদন নেমে এসেছে এক মিলিয়নেরও নিচে।

অতিভারী তেলের জটিল বাস্তবতা

ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ তেল পাওয়া যায় ওরিনোকো অঞ্চলে। এই তেল এতটাই ঘন ও আঠালো যে সাধারণ প্রযুক্তিতে উত্তোলন কঠিন। উত্তোলনের জন্য বাষ্প প্রবেশ করানোর মতো জটিল প্রযুক্তি দরকার হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর জ্বালানি পোড়াতে হয়, ফলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ দ্রুত বাড়ে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের তেল উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ানোর বড় উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

ভয়াবহ গ্যাস পোড়ানো ও মিথেন নিঃসরণ

তেল শোধনাগারে গ্যাস পোড়ানো ভেনেজুয়েলায় বহুদিনের চর্চা। তবে অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তেল উত্তোলনের সময় বের হওয়া প্রাকৃতিক গ্যাস সংরক্ষণ না করে আগুনে পোড়ানো হচ্ছে। এর ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিপুল পরিমাণ মিথেন, যা স্বল্পমেয়াদে কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে বহু গুণ বেশি তাপ ধরে রাখে।

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গ্যাস পোড়ানো দেশগুলোর তালিকায় ভেনেজুয়েলা শীর্ষে উঠে এসেছে। এক বছরে দেশটি তার উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় অর্ধেকই আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে। জলবায়ু বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই হার অবিশ্বাস্যরকম বেশি এবং এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

তেল ছড়িয়ে পরিবেশ বিপর্যয়

দুর্বল হয়ে পড়া তেল খাত ভেনেজুয়েলাকে আরও বড় পরিবেশগত সংকটে ফেলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছরে দেশটিতে হাজার হাজার তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে এই তথ্য প্রকাশ বন্ধ হলেও গবেষকেরা নিয়মিত নতুন দূষণের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় উপকূলীয় জলাভূমি, প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক প্রাণী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

অনেক তেল স্থাপনা সংরক্ষিত বন ও জলাধারের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে তেল ছড়িয়ে পড়লে পানীয় জলের উৎস দূষিত হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন।

বন উজাড় ও অবৈধ খনির বিস্তার

তেল আয়ের পতনের পর সরকার সোনার খনির দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু এই খনির বড় অংশই অবৈধ এবং পরিবেশগত নিয়ম উপেক্ষা করে চলছে। ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। কয়েক বছরে লাখ লাখ একর প্রাথমিক বন ধ্বংস হয়ে গেছে বলে পরিবেশ পর্যবেক্ষকদের হিসাব।

এই খনিতে ব্যবহৃত পারদসহ বিষাক্ত রাসায়নিক নদীতে মিশে মাছ ও পানির উৎস দূষিত করছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ দেশটির জন্য সম্ভাবনার পাশাপাশি এক গভীর সংকটও বয়ে এনেছে। যথাযথ বিনিয়োগ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সম্পদ ভবিষ্যতে জলবায়ু ও প্রকৃতির জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা।