বুয়েনোস আইরেসে ভোরের আলো ফোটার আগেই দীর্ঘ সারি। ছয় ব্লক জুড়ে অপেক্ষা, চোখে ক্লান্তি, মুখে উত্তেজনা। কোনো ধর্মগুরু বা সংগীত তারকাকে দেখার জন্য নয়, মানুষের এই ভিড় একটি ক্রীড়া সামগ্রীর দোকানে ঢোকার জন্য। দীর্ঘদিনের উচ্চ শুল্ক আর কড়াকড়ির পর আর্জেন্টিনায় বিদেশি পণ্যের দরজা খুলে যাওয়াকে অনেকেই দেখছেন নতুন সময়ের সূচনা হিসেবে।
ভোগের দরজা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত
রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলে ক্ষমতায় এসে ধাপে ধাপে বাণিজ্যিক বাধা কমাচ্ছেন। আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে, শুল্ক কমেছে, ব্যক্তিগত ব্যবহারের সীমা বেড়েছে। এর ফলে বিদেশি পোশাক, জুতা, ক্রীড়া সামগ্রী আর অনলাইন কেনাকাটার স্রোত ঢুকছে দেশটির বাজারে। বহু বছর ধরে যে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বিদেশ সফর থেকে লাগেজভর্তি প্রয়োজনীয় জিনিস আনত, তারা এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনছে।

বিদেশি পণ্যের উল্লাস, দেশীয় শিল্পের সংকট
এই উন্মুক্ততার উল্টো পিঠে আছে গভীর উদ্বেগ। দেশীয় উৎপাদকরা বলছেন, বিক্রি কমছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। কৃত্রিম সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী লুসিয়ানো গালফিওনের কারখানায় একসময় পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ হতো। এখন উৎপাদন নেমে এসেছে পাঁচ ভাগের এক ভাগে। কর্মী ছাঁটাই হয়েছে, যারা আছেন তাদেরও কাজ কম।
চীনা অনলাইন বাজারের দাপট
সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে চীনের অনলাইন বিক্রেতারা। বিনা শিপিং খরচে কম দামের পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে হাজার মাইল দূরে। পোশাক, আনুষঙ্গিক সামগ্রী, মোবাইল কভার—সবই হাতের নাগালে। বুয়েনোস আইরেসে পুরোনো সংগ্রহের পোশাক পুনর্বিক্রির দোকানেও ভিড় লেগে থাকছে। দোকান মালিকদের ভাষায়, বাজার ভেঙে দিচ্ছে এই ব্র্যান্ডগুলো।

জাতীয় বিতর্কে সুরক্ষাবাদ বনাম মুক্তবাজার
এই সময়েই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভিন্ন ছবি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক বাড়িয়ে সুরক্ষাবাদের পথে হাঁটছেন, যার প্রভাব পড়ছে আর্জেন্টিনার রপ্তানিতেও। বিরোধী রাজনীতিক মিগেল আনহেল পিচেত্তোর মতে, শক্তিধর দেশ যখন সুরক্ষাবাদে ফিরছে, তখন নির্বিচারে দরজা খুলে দেওয়া আত্মঘাতী। তিনি অনলাইন বিক্রেতাদের কর আরোপ ও নিয়ন্ত্রণের পক্ষে আইন প্রস্তাব তুলেছেন।
সরকারের যুক্তি ও বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা
রাষ্ট্রপতি মিলে অবশ্য অনড়। তাঁর দাবি, সুরক্ষাবাদ টেকসই নয়, মুক্তবাজারে অদক্ষ খাত থেকে দক্ষ খাতে কর্মসংস্থান সরে যাবে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, কর আর উৎপাদন খরচ বেশি থাকা অবস্থায় হঠাৎ শুল্ক তুলে নেওয়া দেশীয় শিল্পকে খোলা আকাশে ফেলে দেওয়ার মতো। কোনো সুরক্ষা ছাড়াই এই উন্মুক্ততা ঝুঁকিপূর্ণ।

ভোক্তার আনন্দ, ভবিষ্যতের প্রশ্ন
মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের কাছে কম দামে পণ্য মানে স্বস্তি। প্রয়োজনের বাইরে কিনতেও আর দ্বিধা নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, কাজ না থাকলে ভোগ টিকবে কীভাবে। আর্জেন্টিনার বাজার আজ বিশ্বমুখী, কিন্তু এই পথে দেশীয় শিল্প কতটা টিকে থাকতে পারবে, সেটাই এখন বড় অনিশ্চয়তা।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















