গাজার উপকূলের একটি তাঁবুতে জন্ম নেওয়া স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার আকুতি শেষ পর্যন্ত হার মানল অবরোধ আর খাদ্যসংকটের কাছে। বারো বছরের হোদা আবু আল নাজার জীবন ছিল একটি শিশুর স্বাভাবিক খেলাধুলা আর হাসির গল্প। কিন্তু যুদ্ধ, অবরোধ আর চিকিৎসার অভাব তাকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় মৃত্যুর দিকে।
শৈশব থেকে মৃত্যুর পথে
হোদা একসময় ছিল প্রাণবন্ত, দায়িত্বশীল আর স্নেহশীল। ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করত, মাটির চুলায় রুটি বানাত, পরিবারের কাজে সাহায্য করত। যুদ্ধের মধ্যেও তার হাসিমুখ ছিল পরিবারের ভরসা। কিন্তু মার্চ মাসে ধরা পড়ে সিলিয়াক রোগ। এই রোগে গমজাত খাদ্য শরীরের জন্য বিষ হয়ে ওঠে, আর প্রয়োজন হয় গ্লুটেনমুক্ত খাদ্য। গাজার বাস্তবতায় সেই খাবার ছিল প্রায় অসম্ভব।

অবরোধে থেমে যায় খাবার
মার্চের শুরুতে গাজায় কঠোর অবরোধ শুরু হলে খাদ্য ও ওষুধ প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফল, সবজি, মাংস, ডিম, মাছ কিংবা গ্লুটেনমুক্ত আটা—সবই হয়ে ওঠে দুর্লভ। এই ঘাটতিতে হোদার শরীর দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। ছয় মাসে তার ওজন কমে যায় এক তৃতীয়াংশ। হাড় বেরিয়ে আসে, চুল ঝরে পড়ে, কথা বলার শক্তিও হারিয়ে যায়।
হাসপাতাল আর হতাশা
চিকিৎসকেরা জানান, সঠিক খাদ্য আর চিকিৎসা পেলে হোদা সুস্থ হতে পারত। কিন্তু গাজার হাসপাতালগুলো নিজেরাই সংকটে। কখনো রক্ত দেওয়া হয়েছে, কখনো দুধ আর সামান্য পরিপূরক খাবার। সাময়িক উন্নতির পর তাঁবুতে ফিরলেই আবার অবনতি। জুনে বিশেষ অপুষ্টি কেন্দ্রে কিছুটা সাড়া মিললেও প্রয়োজনীয় খাদ্য না থাকায় সেই উন্নতি টেকেনি।

মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের ছায়া
গ্রীষ্মে গাজাজুড়ে অপুষ্টি ভয়াবহ রূপ নেয়। হাজার হাজার শিশু ভর্তি হতে থাকে অপুষ্টি কেন্দ্রে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানায়, এটি মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। কিন্তু বাস্তবে খাদ্য পৌঁছায়নি প্রয়োজন অনুযায়ী। হোদার পরিবার নিজেরাও না খেয়ে শিশুটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। একটি আপেলের দাম পৌঁছায় এমন উচ্চতায় যে বাবা বলেছিলেন, মেয়েকে বাঁচাতে তাকে কোটিপতি হতে হতো।
বিদেশে চিকিৎসার আশা, কিন্তু দেরি
হোদার অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় বিদেশে চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনুমতি, সমন্বয় আর অপেক্ষার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময় গড়িয়ে যায়। অক্টোবরে সে জরুরি বিভাগে ভর্তি হয়। বিছানায় শুয়ে সে বলেছিল, অন্য বাচ্চাদের মতো খেলতে চায়, সমুদ্রে যেতে চায়। কিন্তু শরীর আর সায় দেয়নি।

নিভে যাওয়া স্বপ্ন
অক্টোবরের এক সকালে চিকিৎসা প্রতিবেদনে লেখা হয়, শিশুটি পরম করুণাময়ের ডাকে সাড়া দিয়েছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় তীব্র অপুষ্টি আর সংক্রমণজনিত শক। সেদিনই তাঁবুর কাছেই তাকে দাফন করা হয়। পরে জানা যায়, বিদেশে চিকিৎসার অনুমোদন তখনই চূড়ান্ত হয়েছিল। যে দেশে তাকে নেওয়ার কথা ছিল, সেই দরজাও খুলেছিল, কিন্তু হোদা আর বেঁচে ছিল না।
এই গল্প শুধু একটি শিশুর নয়। এটি অবরোধ, যুদ্ধ আর অবহেলার ভেতর আটকে থাকা অসংখ্য শিশুর নীরব আর্তনাদ।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















