একদিনের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাঁকে দেখবে, জানতেন মারিনা ভিওত্তি। প্যারিস অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সেই সকালে তাঁর দুশ্চিন্তা ছিল একটাই—সারা দিন বসে থাকা যাবে না, কিছু একটা করতে হবে। এই অস্থিরতাই যেন তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি। অপেরা, হেভি মেটাল, দর্শন, সাহিত্য—সবকিছুর ভেতর দিয়ে হেঁটে আজ তিনি সমকালীন সংগীতজগতের অন্যতম আলোচিত কণ্ঠ।
বর্তমানে জুরিখ অপেরায় ‘ডি ফ্লেডারমাউস’ মঞ্চস্থ করছেন মারিনা ভিওত্তি। একই মৌসুমে তিনি গেয়েছেন ওয়ের্থার, ইডিপাস রেক্স ও কারমেনের মতো ভিন্ন স্বাদের চরিত্র। বারোক থেকে আধুনিক অপেরা—প্রায় সব ঘরানায় স্বচ্ছন্দ এই সুইস বংশোদ্ভূত মেজো সোপ্রানোকে নিয়ে থিয়েটার পরিচালকরা বলেন, তাঁকে যে কোনো রেপার্টরিতে কাস্ট করা যায়।

শৈশব, পরিবার আর সংগীতের উত্তরাধিকার
মারিনার জন্ম এক সংগীতপরিবারে। বাবা ছিলেন খ্যাতিমান কন্ডাক্টর, মা ফরাসি বেহালাবাদক। ছোটবেলা থেকেই বিশ্বভ্রমণ আর অপেরার পরিবেশে বড় হওয়া। পাঁচ বছর বয়সেই তিনি ঠিক করে ফেলেছিলেন, অপেরা শিল্পী হবেন। তবে আঠারো বছরে বাবার আকস্মিক মৃত্যু তাঁর জীবন ওলটপালট করে দেয়। শোক আর বিষণ্নতা থেকে তিনি দূরে সরে যান ধ্রুপদি সংগীত থেকে।
হেভি মেটালে আশ্রয়, নতুন পরিচয়ের জন্ম
এই সময়েই তাঁর জীবনে আসে হেভি মেটাল। অন্ধকার, তীব্র এই সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর আশ্রয়। নিজস্ব লেখা, মঞ্চে চিৎকার, নতুন এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া—সব মিলিয়ে মারিনা যেন নিজেকে নতুনভাবে খুঁজে পান। পরিবারের সমর্থনও ছিল। গথিক পোশাক, ট্যাটু, ভিন্ন জীবনধারা—সবই মেনে নিয়েছিলেন তাঁর মা।

ফিরে আসা আর কণ্ঠসাধনার লড়াই
সাহিত্য ও দর্শনে পড়াশোনার পাশাপাশি কনসার্ট আয়োজন করতে গিয়ে আবার ধ্রুপদি সংগীতের মুখোমুখি হন মারিনা। ভিয়েনায় অপেরা দেখতে গিয়ে বুঝতে পারেন, এটাই তাঁর জায়গা। তবে বয়স, হেভি মেটালের পটভূমি আর বাহ্যিক রূপ—সব মিলিয়ে কনসারভেটরিগুলো তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত একজন প্রশিক্ষকের কাছে সুযোগ পান। পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তাঁর কণ্ঠে আগেই লুকিয়ে ছিল অপেরার বীজ।
ক্যানসারের ধাক্কা আর প্রত্যাবর্তন
ক্যারিয়ার গড়ার মুহূর্তে মারাত্মক ক্যানসারে আক্রান্ত হন মারিনা। চিকিৎসা চললেও বিষয়টি গোপন রাখেন। ভয় ছিল, দুর্বল তকমা লেগে যাবে। চিকিৎসা শেষে লা স্কালায় অভিষেক হয় তাঁর। ক্লান্ত শরীরেও মঞ্চে ওঠা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত। মহামারি সময়টায় বিশ্রাম আর সাধনায় আরও পরিণত হয় তাঁর কণ্ঠ।

অলিম্পিক, গ্র্যামি আর সেতুবন্ধন
প্যারিস অলিম্পিকের মঞ্চে গাওয়া, হেভি মেটাল ব্যান্ডের সঙ্গে গ্র্যামি জয়, ব্ল্যাক সাবাথের শেষ কনসার্টে অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে মারিনা ভিওত্তির পথ এখন দুই জগতের সেতু। তাঁর বিশ্বাস, অপেরা নতুন দর্শক চায়। মেটালের সঙ্গে অপেরার মেলবন্ধন তরুণদের কাছে এই শিল্পকে নতুনভাবে পৌঁছে দিতে পারে। তাঁর ভাষায়, এতদিন যেটা অদ্ভুত ছিল, আজ সেটাই হয়ে উঠেছে সময়ের ভাষা।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















