যুক্তরাষ্ট্রে মদ্যপান সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। পুরুষদের জন্য দৈনিক মদ্যপানের প্রস্তাবিত সীমা এক গ্লাসে নামিয়ে আনার যে খসড়া প্রস্তুত হয়েছিল, তা প্রকাশের আগেই বাতিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা দপ্তরের কর্মকর্তারা গত বসন্তে যে খসড়া তৈরি করেছিলেন, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল মদ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। খসড়ায় উল্লেখ ছিল, নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য দৈনিক এক গ্লাস বা তার কম মদ্যপান নিশ্চিত করা গেলে প্রতিবছর হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব। নারীদের ক্ষেত্রে সীমা অপরিবর্তিত রেখে পুরুষদের জন্য তা কমানোর প্রস্তাবই ছিল মূল বিষয়।
ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা
খসড়া প্রস্তাবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা লিখেছিলেন, অল্প মাত্রার মদ্যপানও স্তন ক্যানসারসহ মাথা ও ঘাড়ের বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ক্যানসার গবেষণার এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, এক গ্লাসের কম মদ্যপানেও ঝুঁকি বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে বলেই নির্দেশিকা কঠোর করার কথা ভাবা হয়েছিল।

কিন্তু সেই খসড়া আর আলোর মুখ দেখেনি। বরং নতুন নির্দেশিকায় মদ্যপানের নির্দিষ্ট পরিমাণের কথা পুরোপুরি বাদ দিয়ে শুধু বলা হয়েছে, সুস্বাস্থ্যের জন্য কম মদ্যপান করাই ভালো।
দীর্ঘদিনের নির্দেশিকা বাতিল
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চালু থাকা পুরুষদের জন্য দৈনিক দুই গ্লাস এবং নারীদের জন্য এক গ্লাস মদ্যপানের সুপারিশ কার্যত বাতিল হলো। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নির্দিষ্ট সীমা তুলে দেওয়ায় মানুষ নিজের মতো করে ‘পরিমিত’ শব্দের ব্যাখ্যা করবে, যার ফলে মদ্যপান বাড়তে পারে এবং এর সঙ্গে বাড়তে পারে মদজনিত মৃত্যু ও রোগ।
সাবেক এক সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, সীমা না থাকলে মানুষ নিজের সুবিধামতো মাত্রা নির্ধারণ করবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
শিল্পখাতের চাপ ও লবিংয়ের অভিযোগ
এই পরিবর্তনের পেছনে বহুজাতিক মদ শিল্পের দীর্ঘদিনের লবিং ভূমিকা রেখেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বৈশ্বিকভাবে বিপুল বিক্রয়মূল্যের এই শিল্প কয়েক বছর ধরেই নতুন খাদ্য ও পানীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিল। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কেবল বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে, শিল্পখাতের চাপে নয়।
হোয়াইট হাউসের এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আদর্শ পরিস্থিতিতে মদ্যপান না করাই সবচেয়ে ভালো, তবে সামাজিক যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও মানুষ মদ্যপান করে থাকে। তাঁর মতে, আগের নির্দেশিকায় নির্ধারিত সীমার পেছনে যথেষ্ট শক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ছিল না।
পরস্পরবিরোধী গবেষণার দ্বন্দ্ব
মদ্যপানের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক গবেষণার ভিন্ন ভিন্ন ফলাফলও এই বিতর্ককে জটিল করে তুলেছে। কংগ্রেসের অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, পরিমিত মদ্যপান সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য দপ্তরের উদ্যোগে করা আরেকটি গবেষণায় সতর্ক করা হয়, দৈনিক এক গ্লাস মদ্যপানও যকৃত, মুখ ও গলার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে সক্ষম।

মদ শিল্পের সংগঠনগুলো প্রথম গবেষণাটিকে বেশি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বলে তুলে ধরে, আর দ্বিতীয় গবেষণাকে পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যা দেয়। তবে ওই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা বলেন, জনগণের জানা উচিত যে মদ ক্যানসারের কারণ হতে পারে।
কর্মকর্তাদের অপসারণ ও নীতির মোড় ঘোরা
২০২৫ সালের শুরুতে নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য দপ্তরে বড় ধরনের পুনর্গঠন হয়। এ সময় হাজারো কর্মী ছাঁটাই করা হয় এবং মদ্যপান সংক্রান্ত কঠোর নির্দেশিকা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা চাকরি হারান বা প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে নতুন দল গঠন করে শিল্পখাতের পছন্দের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত নির্দেশিকা তৈরি করা হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের মদ্যপান সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















