অক্টোবরের শেষ রাত। শহরের দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেমে এসে কফির আড্ডা আর ছোটখাটো কেনাকাটায় মেতেছিলেন মানুষ। হঠাৎই সেই শান্ত দৃশ্য ভেঙে পড়ে গুলির শব্দে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সতর্কতা ছাড়াই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
শহরের ভেতরে ভয়াবহ হামলা
মোয়ানজা শহরের মজিমওয়েমা এলাকায় একটি ক্যাফেতে আশ্রয় নেওয়া পুরুষদের মাটিতে শুয়ে পড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর কাছ থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান। গুলিবর্ষণ থামার পর সেখানে পড়ে থাকে এক ডজনের বেশি নিথর দেহ। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রক্তাক্ত মাটিতে ছড়িয়ে থাকা অন্তত তেরোটি লাশ দেখা যায়।
এই ঘটনা ছিল নির্বাচনের সময়কার সহিংসতার অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়। স্থানীয়দের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। একই ধরনের হামলার বর্ণনা পাওয়া গেছে রাজধানী দার এস সালাম ও উত্তরাঞ্চলীয় শহর আরুশা থেকেও। অনেক ক্ষেত্রেই বিক্ষোভস্থল থেকে বহু দূরে থাকা সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ।

নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার বিস্তার
অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিরোধী প্রার্থীদের বাদ দেওয়া, গণগ্রেপ্তার ও নিখোঁজের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। নির্বাচনের দিন তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সহিংসতা এতটাই তীব্র হয় যে স্বাধীনতার পর এটিকে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্থিরতা বলে বর্ণনা করছেন বিশ্লেষকেরা।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এই সময় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রও পরিস্থিতির কারণে তানজানিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে।
লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার অভিযোগ
ক্যাথলিক বিশপদের সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধি চার্লস কিতিমা বলেন, ঘরে বসে থাকা মানুষ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন। তার ভাষায়, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যা। তিনি স্বীকার করেন, কিছু জায়গায় লুটপাট হয়েছিল, তবে অধিকাংশ বিক্ষোভকারী অপরাধী ছিলেন না, তারা তাদের দাবি জানাচ্ছিলেন।

সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, অনেক অভিযোগ যাচাইহীন ও প্রেক্ষাপটহীন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত সহিংসতার কোনো নীতি নেই।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক
নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসান। তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। তবে জাতিসংঘ নিযুক্ত বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কারফিউ চলাকালে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এমন উদ্বেগজনক তথ্য তারা পেয়েছেন। সরকার এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিচারবহির্ভূতভাবে নিহতের সংখ্যা অন্তত সাত শত। যদিও সরকার বলছে, সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ক্যাফেতে গুলিবর্ষণের ভয়াল দৃশ্য
মজিমওয়েমা এলাকার ক্যাফেটিতে সেদিন কোনো বিক্ষোভ ছিল না বলে স্থানীয়রা জানান। সন্ধ্যার পর পুলিশ লোকজনকে ঘরে ফিরতে বললেও অনেকেই নির্দেশ মানেননি। কয়েক ঘণ্টা পর অল্পসংখ্যক পুলিশ সদস্য হেঁটে এসে চারদিকে গুলি ছোড়েন। আতঙ্কে মানুষ দৌড়ে পালান। যারা ক্যাফেতে ছিলেন, তারা আলো নিভিয়ে লুকানোর চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত বাইরে শুইয়ে রেখে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়।

একজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি জানান, নড়াচড়া করলে আবার গুলি করা হবে এমন ভয়ে তিনি স্থির হয়ে পড়ে ছিলেন। পুলিশ চলে যাওয়ার পর তিনি চারপাশে বহু মৃত ও আহত মানুষ দেখতে পান।
লাশ সরানো ও নিখোঁজের প্রশ্ন
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কিছুক্ষণ পর পুলিশ গাড়িতে করে লাশ তুলে নিয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছানো আহতদের মধ্যেও অনেকেই মারা যান। নিহতদের কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে, যাদের কেউই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পরিবারগুলো আজও তাদের স্বজনদের সন্ধান পাচ্ছে না।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রমাণ গোপনের উদ্দেশ্যে লাশ অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সরকার অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর সেই ক্যাফেটি ভেঙে ফেলা হয়, কে বা কারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা স্পষ্ট নয়।
অনিশ্চিত অপেক্ষা
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন কবে প্রকাশ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বিচার ও জবাবদিহির আশায় দিন গুনছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















