ইরান কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ দমাতে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট ও টেলিফোন যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে, বাতিল হয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এই পরিস্থিতিতে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এবং বিদেশি শক্তির মদদের অভিযোগ তুলেছেন।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ইরান
শুক্রবার ভোর থেকে ইরানের সঙ্গে বিশ্বের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ইন্টারনেট অচল, বিদেশ থেকে ফোন করা যাচ্ছে না, অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোও অনিয়মিতভাবে হালনাগাদ হচ্ছে। দুবাইসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নির্ধারিত একাধিক ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সর্বোচ্চ নেতার কড়া ভাষণ
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে খামেনেই বলেন, বিক্ষোভকারীরা বিদেশিদের ইশারায় সরকারি সম্পদ ধ্বংস করছে। তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নাম উল্লেখ করে বলেন, বিদেশি শক্তির ভাড়াটে হিসেবে কাজ করলে তা সহ্য করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পকে নিজের দেশ সামলানোর পরামর্শ দেন।

অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে রাজনৈতিক স্লোগান
গত মাসের শেষ দিকে তীব্র মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রামান পতনের প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই সরকারবিরোধী স্লোগানে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন শহরে ‘স্বৈরশাসকের পতন’সহ শাসকদের বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান শোনা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রচারিত ভিডিওতে বাস, গাড়ি, মোটরসাইকেল পোড়ানো এবং মেট্রো স্টেশন ও ব্যাংকে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য দেখা গেছে।
বিরোধী গোষ্ঠী ও প্রবাসীদের ডাক
ইরানের বাইরে থাকা বিরোধী গোষ্ঠীগুলো আরও বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছে। সাবেক শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি সামাজিক মাধ্যমে ইরানিদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানান। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, তিনি পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন না এবং প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়াকেও উপযুক্ত মনে করছেন না।

সহিংসতা ও দমন-পীড়নের চিত্র
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করেছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ভেঙে যাওয়া বিরোধী সংগঠন পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন এই সহিংসতার পেছনে রয়েছে। কাস্পিয়ান সাগরসংলগ্ন রাশত শহরে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে এক সাংবাদিক বলেন, এলাকা যেন যুদ্ধক্ষেত্র, দোকানপাট ধ্বংস হয়ে গেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, দেশজুড়ে সংঘর্ষে ইতিমধ্যে বহু মানুষের প্রাণ গেছে।
আন্তর্জাতিক চাপ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ইরান অতীতেও বড় বিক্ষোভ দমন করেছে, তবে এবার অর্থনৈতিক সংকট ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পুনর্বহাল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। এই বিক্ষোভ এখনো ২০২২ সালে নারী অধিকার আন্দোলনের সময়কার ব্যাপকতার কাছাকাছি না পৌঁছালেও, মাহসা আমিনি-র মৃত্যুকে ঘিরে সেই আন্দোলনের পর এটাই শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















