ক্যারিবিয়ান সাগরে ধীরগতির এক নাটকীয় ধাওয়া দিয়ে শুরু হয়েছিল ঘটনাপ্রবাহ। গত মাসে মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী একটি তেলবাহী জাহাজে ওঠার চেষ্টা করেছিল, যেটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তেল পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সে চেষ্টা তখন ব্যর্থ হয়। কয়েক সপ্তাহ পর সেই জাহাজই নতুন নাম ও নতুন পতাকা নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে দেখা দেয়। এবার সেটি রুশ পরিচয়ে চলছিল এবং রক্ষায় এগিয়ে আসছিল রুশ সাবমেরিন। কিন্তু জানুয়ারির সাত তারিখে আইসল্যান্ডের কাছে হঠাৎ অভিযানে নেমে পড়ে মার্কিন বাহিনী। রশি বেয়ে জাহাজে নামার মধ্য দিয়ে শেষ হয় সেই পলায়ন। একই দিনে ক্যারিবিয়ান জলেই আরেকটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে তারা।

ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার নাটক আর সমুদ্রের অভিযান
এই অভিযানগুলো এসেছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে জানুয়ারির তিন তারিখে অপহরণের ঘটনার পরপরই। কারাকাসে নতুন শাসকদের ওপর চাপ বাড়াতে যে ওয়াশিংটন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এই জব্দ অভিযান তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত। সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষকদের মতে, অভিযুক্ত জাহাজটি গত দুই হাজার কুড়ি সালের শেষ দিক থেকে ইরানের দুই কোটি ব্যারেল এবং ভেনেজুয়েলার প্রায় পঞ্চাশ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করেছে, যার বড় অংশ গেছে চীনে। মার্কিন উপকূলরক্ষীদের মুখোমুখি হওয়ার সময় জাহাজটি ভেনেজুয়েলার দিকেই যাচ্ছিল, সম্ভবত নতুন করে তেল তুলতে। পরে এর উত্তরের দিকে ছুটে চলা দেখে ধারণা করা হয়, সেটি রাশিয়ার উত্তর বন্দরমুখী ছিল।

আইনের ফাঁক আর পতাকা বদলের খেলা
আইনি দৃষ্টিতে এই জাহাজ জব্দ করা যুক্তিসংগত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাজটি প্রথমে যে দেশের পতাকা দেখাচ্ছিল, তা ভুয়া বলে ধরা পড়ে। সমুদ্র আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রহীন জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় তল্লাশি ও জব্দের আওতায় পড়ে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে জাহাজটির গায়ে রুশ পতাকা আঁকা হয় এবং পরে তা রাশিয়ার সামুদ্রিক নিবন্ধনে উঠে আসে। কিন্তু সমুদ্র আইন স্পষ্টভাবে বলে, মালিকানা বা নিবন্ধন প্রকৃতভাবে বদল না হলে যাত্রাপথে বা বন্দরে পতাকা পরিবর্তন করা বেআইনি। তবু এই অভিযানে মস্কো ওয়াশিংটনের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ছায়া বহরের আতঙ্ক
এই অভিযান অন্য বহু রূপ বদলানো জাহাজের জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠেছে। সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলোর মতে, গত ছয় মাসে এক ডজনেরও বেশি তেলবাহী জাহাজ নিজেদের পরিচয় রাশিয়ার সঙ্গে জুড়ে নিয়েছে, যাতে জব্দের ঝুঁকি কমে। ডিসেম্বর মাসে ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কড়া হওয়ার পর এই প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ভেনেজুয়েলার তেল বহনকারী ষোলটি জাহাজ একসঙ্গে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা চালায়। এর মধ্যেই ক্যারিবিয়ান জলে আরেকটি জাহাজ জব্দ করে আমেরিকা।
চাপ অব্যাহত রাখার বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন এবার কোনো নজির ভাঙতে চায়নি। আগের ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে তারা দেখিয়ে দিল, সমুদ্রপথে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তার মূল্য দিতে হবে। ভেনেজুয়েলার নতুন শাসকদের জন্য এই বার্তা স্পষ্ট—তেল রপ্তানির ছায়া পথ আর নিরাপদ নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















