০৬:১০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম নেপালের জেন-জি আন্দোলনের এক বছর: বদলেছে সরকার, বদলায়নি আহতদের জীবন ১৮৮ কর্মকর্তার বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ইরান যুদ্ধের সমীকরণ বদলে আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে: সেনা উপপ্রধান সার দিতে দেরি, ডিলারের গুদাম ভেঙে শতাধিক বস্তা সার লুট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট গর্ভনিরোধক সরবরাহ স্বাভাবিক হবে ২-৩ মাসের মধ্যে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামে মৃত্যু ৯৯৭, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৪ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩১৪ জন পাবনায় বিএনপি নেতাকে গুলি করে কুপিয়ে হত্যা

জাপানে বিদেশি আতঙ্ক কেন বাড়ছে, যখন অর্থনীতির জন্য তাদেরই সবচেয়ে বেশি দরকার

জাপানের প্রাচীন রাজধানী নারা মন্দির আর পবিত্র হরিণের জন্য বিখ্যাত। এই হরিণদের দেবতার দূত মনে করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শান্ত শহরই জড়িয়ে পড়েছে এক অস্বস্তিকর রাজনৈতিক বিতর্কে। ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের প্রচারে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দাবি করেন, বিদেশি পর্যটকেরা নাকি এই পবিত্র হরিণদের লাথি মারছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে জাপানের রাজনীতিতে নতুন এক প্রবণতা—বিদেশিদের ঘিরে ভয় ও সন্দেহ।

এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তবু বক্তব্যটি সমাজে জমে থাকা এক গভীর উদ্বেগকে সামনে নিয়ে আসে। পর্যটক, শ্রমিক কিংবা বিনিয়োগকারী—বিদেশিদের উপস্থিতি এখন জাপানের রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয়। জাপান ফার্স্ট স্লোগানধারী নতুন দল দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, আর ঐতিহ্যবাহী শাসক দল সমর্থন হারানোর আশঙ্কায় বিদেশিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার পথে হাঁটছে।

বিদেশি আতঙ্কের পেছনের বাস্তবতা
এই আতঙ্কের পেছনে তিনটি বাস্তব পরিবর্তন কাজ করছে। প্রথমত, বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বেড়েছে। এক দশকের কিছু বেশি সময়ে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে পৌঁছেছে প্রায় সাঁইত্রিশ লক্ষে। দ্বিতীয়ত, পর্যটনের বিস্ফোরণ ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ জাপানে ভ্রমণে এসেছে। তৃতীয়ত, দুর্বল ইয়েনের সুযোগ নিয়ে বিদেশিরা নাকি সস্তায় জাপানি সম্পত্তি কিনে নিচ্ছে—এমন ধারণা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই সংখ্যা খুব বড় নয়। মোট জনসংখ্যার তুলনায় বিদেশির অংশ মাত্র কয়েক শতাংশ। তবু মূল্যস্ফীতি, মজুরি স্থবিরতা আর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় বিরক্ত ভোটারদের জন্য বিদেশিরা সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

শ্রম সংকট আর নীরব বাস্তবতা
বাস্তবতা হলো, জাপানের অর্থনীতি বিদেশি শ্রমিক ছাড়া এগোতে পারছে না। জনসংখ্যা দ্রুত কমছে, গ্রামাঞ্চলে শ্রমিকের তীব্র অভাব। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সামান্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতেও বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন বাড়াতে হবে। কনভিনিয়েন্স দোকান থেকে শুরু করে বৃদ্ধাশ্রম, হোটেল, জাহাজ নির্মাণশালা আর ধানক্ষেত—সবখানেই বিদেশিরা এখন অপরিহার্য।

তবু সরকার প্রকাশ্যে বলে চলেছে, দেশে কোনো অভিবাসন নীতি নেই। আড়ালে শ্রমিক আনার ব্যবস্থা বাড়ানো হলেও প্রকাশ্যে এই স্বীকারোক্তির অভাব বিদেশিবিরোধী শক্তিকে আরও জোরালো করেছে। অভিবাসন অধিকারকর্মীদের মতে, এই দ্বিধা বিদেশিদের সমাজে মিশে যাওয়ার পথ আরও কঠিন করে তুলছে।

পর্যটন, ক্ষোভ আর দ্বন্দ্ব
মহামারির সময় পর্যটক প্রায় ছিল না। সীমান্ত খুলতেই তারা ফিরেছে ঢেউয়ের মতো। পর্যটন এখন গাড়ি শিল্পের পর জাপানের বড় আয়ের খাত। তবু সমস্যা তৈরি হয়েছে ভিড়ের কেন্দ্রীভবনে। কিছু শহর আর দর্শনীয় স্থানে অতিরিক্ত ভিড় স্থানীয়দের বিরক্ত করছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো কয়েকটি অসৌজন্যমূলক ঘটনার ভিডিও ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।

অনেকে মনে করেন, দুর্বল মুদ্রার সুবিধা পাচ্ছে বিদেশিরা, অথচ সাধারণ জাপানিদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এই তুলনাই তিক্ততা বাড়াচ্ছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিয়ে গুজব।

কঠোর নীতির পথে সরকার
এই ক্ষোভ সামাল দিতে সরকার একের পর এক কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবছে। অসদাচরণকারী বিদেশিদের জন্য আলাদা তদারকি ব্যবস্থা, শ্রমিক প্রবেশে সীমা, ভিসা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান, এমনকি পর্যটক কর আর স্থায়ী বসবাসের জন্য ভাষা শর্ত—সবই আলোচনায়। রাজনৈতিকভাবে এতে লাভ হলেও অর্থনীতিতে এর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট।

গ্রামাঞ্চলের ভিন্ন ছবি
চমকপ্রদভাবে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ বিদেশিদের বেশি গ্রহণ করছে। কারণ তাদের চোখের সামনে শ্রম সংকট। মাছধরা সমবায় থেকে কৃষিখামার—বিদেশি কর্মী না এলে কাজই বন্ধ হয়ে যাবে। অনেকের ভাষায়, বিদেশিরা না এলে বিপদে পড়বে জাপানই।

নারার হরিণ আর সত্য
নারায় হরিণ সংরক্ষণে যুক্ত কর্মীরা বলছেন, বিদেশিরা হরিণে লাথি মারছে—এমন দৃশ্য তারা কখনো দেখেননি। বরং বহু বিদেশি এখানে এসে জায়গাটির বিশেষত্ব বুঝে সম্মান দেখায়। তাদের মতে, ভুল তথ্য আর ভয়ের রাজনীতি বাস্তবতাকে ঢেকে দিচ্ছে।

জাপান আজ এক দ্বিধার মুখে। একদিকে বিদেশি ছাড়া অর্থনীতি চলবে না, অন্যদিকে রাজনীতিতে বাড়ছে বিদেশি আতঙ্ক। এই দুইয়ের সংঘাতই ঠিক করে দেবে ভবিষ্যতের জাপান কতটা খোলা আর কতটা সঙ্কুচিত হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম

জাপানে বিদেশি আতঙ্ক কেন বাড়ছে, যখন অর্থনীতির জন্য তাদেরই সবচেয়ে বেশি দরকার

০৪:৩৪:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

জাপানের প্রাচীন রাজধানী নারা মন্দির আর পবিত্র হরিণের জন্য বিখ্যাত। এই হরিণদের দেবতার দূত মনে করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শান্ত শহরই জড়িয়ে পড়েছে এক অস্বস্তিকর রাজনৈতিক বিতর্কে। ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের প্রচারে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দাবি করেন, বিদেশি পর্যটকেরা নাকি এই পবিত্র হরিণদের লাথি মারছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে জাপানের রাজনীতিতে নতুন এক প্রবণতা—বিদেশিদের ঘিরে ভয় ও সন্দেহ।

এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তবু বক্তব্যটি সমাজে জমে থাকা এক গভীর উদ্বেগকে সামনে নিয়ে আসে। পর্যটক, শ্রমিক কিংবা বিনিয়োগকারী—বিদেশিদের উপস্থিতি এখন জাপানের রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয়। জাপান ফার্স্ট স্লোগানধারী নতুন দল দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, আর ঐতিহ্যবাহী শাসক দল সমর্থন হারানোর আশঙ্কায় বিদেশিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার পথে হাঁটছে।

বিদেশি আতঙ্কের পেছনের বাস্তবতা
এই আতঙ্কের পেছনে তিনটি বাস্তব পরিবর্তন কাজ করছে। প্রথমত, বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বেড়েছে। এক দশকের কিছু বেশি সময়ে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে পৌঁছেছে প্রায় সাঁইত্রিশ লক্ষে। দ্বিতীয়ত, পর্যটনের বিস্ফোরণ ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ জাপানে ভ্রমণে এসেছে। তৃতীয়ত, দুর্বল ইয়েনের সুযোগ নিয়ে বিদেশিরা নাকি সস্তায় জাপানি সম্পত্তি কিনে নিচ্ছে—এমন ধারণা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই সংখ্যা খুব বড় নয়। মোট জনসংখ্যার তুলনায় বিদেশির অংশ মাত্র কয়েক শতাংশ। তবু মূল্যস্ফীতি, মজুরি স্থবিরতা আর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় বিরক্ত ভোটারদের জন্য বিদেশিরা সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

শ্রম সংকট আর নীরব বাস্তবতা
বাস্তবতা হলো, জাপানের অর্থনীতি বিদেশি শ্রমিক ছাড়া এগোতে পারছে না। জনসংখ্যা দ্রুত কমছে, গ্রামাঞ্চলে শ্রমিকের তীব্র অভাব। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সামান্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতেও বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন বাড়াতে হবে। কনভিনিয়েন্স দোকান থেকে শুরু করে বৃদ্ধাশ্রম, হোটেল, জাহাজ নির্মাণশালা আর ধানক্ষেত—সবখানেই বিদেশিরা এখন অপরিহার্য।

তবু সরকার প্রকাশ্যে বলে চলেছে, দেশে কোনো অভিবাসন নীতি নেই। আড়ালে শ্রমিক আনার ব্যবস্থা বাড়ানো হলেও প্রকাশ্যে এই স্বীকারোক্তির অভাব বিদেশিবিরোধী শক্তিকে আরও জোরালো করেছে। অভিবাসন অধিকারকর্মীদের মতে, এই দ্বিধা বিদেশিদের সমাজে মিশে যাওয়ার পথ আরও কঠিন করে তুলছে।

পর্যটন, ক্ষোভ আর দ্বন্দ্ব
মহামারির সময় পর্যটক প্রায় ছিল না। সীমান্ত খুলতেই তারা ফিরেছে ঢেউয়ের মতো। পর্যটন এখন গাড়ি শিল্পের পর জাপানের বড় আয়ের খাত। তবু সমস্যা তৈরি হয়েছে ভিড়ের কেন্দ্রীভবনে। কিছু শহর আর দর্শনীয় স্থানে অতিরিক্ত ভিড় স্থানীয়দের বিরক্ত করছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো কয়েকটি অসৌজন্যমূলক ঘটনার ভিডিও ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।

অনেকে মনে করেন, দুর্বল মুদ্রার সুবিধা পাচ্ছে বিদেশিরা, অথচ সাধারণ জাপানিদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এই তুলনাই তিক্ততা বাড়াচ্ছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিয়ে গুজব।

কঠোর নীতির পথে সরকার
এই ক্ষোভ সামাল দিতে সরকার একের পর এক কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবছে। অসদাচরণকারী বিদেশিদের জন্য আলাদা তদারকি ব্যবস্থা, শ্রমিক প্রবেশে সীমা, ভিসা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান, এমনকি পর্যটক কর আর স্থায়ী বসবাসের জন্য ভাষা শর্ত—সবই আলোচনায়। রাজনৈতিকভাবে এতে লাভ হলেও অর্থনীতিতে এর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট।

গ্রামাঞ্চলের ভিন্ন ছবি
চমকপ্রদভাবে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ বিদেশিদের বেশি গ্রহণ করছে। কারণ তাদের চোখের সামনে শ্রম সংকট। মাছধরা সমবায় থেকে কৃষিখামার—বিদেশি কর্মী না এলে কাজই বন্ধ হয়ে যাবে। অনেকের ভাষায়, বিদেশিরা না এলে বিপদে পড়বে জাপানই।

নারার হরিণ আর সত্য
নারায় হরিণ সংরক্ষণে যুক্ত কর্মীরা বলছেন, বিদেশিরা হরিণে লাথি মারছে—এমন দৃশ্য তারা কখনো দেখেননি। বরং বহু বিদেশি এখানে এসে জায়গাটির বিশেষত্ব বুঝে সম্মান দেখায়। তাদের মতে, ভুল তথ্য আর ভয়ের রাজনীতি বাস্তবতাকে ঢেকে দিচ্ছে।

জাপান আজ এক দ্বিধার মুখে। একদিকে বিদেশি ছাড়া অর্থনীতি চলবে না, অন্যদিকে রাজনীতিতে বাড়ছে বিদেশি আতঙ্ক। এই দুইয়ের সংঘাতই ঠিক করে দেবে ভবিষ্যতের জাপান কতটা খোলা আর কতটা সঙ্কুচিত হবে।