বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে হতাশার পূর্বাভাস দেওয়া বিশ্লেষকদের সাম্প্রতিক বছরগুলো ভালো যায়নি। দুই হাজার পঁচিশ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রায় তিন শতাংশে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বছরের শুরুতে দেওয়া অনেক পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি। এই ধারাবাহিকতা নতুন নয়। দুই হাজার বিশের দশকের প্রতিটি বছরেই বৈশ্বিক অর্থনীতি পূর্বানুমানকে ছাপিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। অভিবাসন কমার প্রভাব সত্ত্বেও দেশটির অর্থনৈতিক গতি খুব সামান্যই কমেছে। সুদের হার কমে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানিতে সরকারি ব্যয় বাড়ায় প্রবৃদ্ধি আরও ভর পেয়েছে।
টিকে থাকা মানেই সাফল্য নয়
বিশ্ব অর্থনীতির এই স্থিতিশীলতা অনেকের চোখে বিস্ময়কর, কারণ একই সময়ে বিভিন্ন দেশে সুরক্ষাবাদী নীতি জোরদার হয়েছে। শিল্পনীতি বিস্তৃত হয়েছে, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে খণ্ডিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তবু তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির চিহ্ন স্পষ্ট নয়। এ সুযোগে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকেরা বলছেন, বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাস্তবতা হলো, তারা আংশিকভাবে ঠিক হলেও পুরোপুরি নয়।
উৎপাদন খাতে স্থবিরতা
সুরক্ষাবাদ প্রবৃদ্ধিকে এখনো বড় ধাক্কা দিতে না পারলেও এর মূল লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে। কারখানাভিত্তিক কর্মসংস্থানের পতন থামেনি। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাত টানা কয়েক মাস ধরে সংকুচিত হচ্ছে। আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করছে। নির্মাণ ব্যয় কমেছে, কমেছে কর্মীর সংখ্যাও।
বৈশ্বিক চিত্র আরও হতাশাজনক
এই সংকট শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খাত গত কয়েক বছর ধরে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় পিছিয়ে। আফ্রিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই শ্রমশক্তির মধ্যে কারখানার চাকরির অংশ কমেছে। নানা দেশের শিল্পকেন্দ্রিক নীতিও দীর্ঘমেয়াদি এই প্রবণতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।
প্রযুক্তির চাপ ও ভবিষ্যৎ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে শ্বেতপেশার চাকরি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সবচেয়ে বেশি বিঘ্নের মুখে পড়ছে কারখানার শ্রমিকেরা। সাম্প্রতিক সময়ে কারখানায় নতুন নিয়োগ কমেছে অফিসভিত্তিক কাজের চেয়েও দ্রুত। সেন্সর ও ক্যামেরা থেকে সংগৃহীত তথ্য দিয়ে চালিত প্রযুক্তি কারখানার যন্ত্রকে আরও দক্ষ করছে। উৎপাদন বাড়লেও চাকরি আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
চীনের ব্যতিক্রমী অবস্থান
উৎপাদন খাতে একমাত্র বড় ব্যতিক্রম চীন। বৈশ্বিক উৎপাদনমূল্যে দেশটির অংশ প্রায় এক তৃতীয়াংশ। তবে এই শক্তি পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ালেও চীনের অর্থনীতিতে তা স্বস্তি আনেনি। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে কারখানা টিকিয়ে রাখার ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন তৈরি হয়েছে, যা মূল্যহ্রাসের চাপ বাড়াচ্ছে।
বাজারই টিকে থাকার কারণ
বিশ্ব অর্থনীতি যে এখনো টিকে আছে, তার পেছনে বড় কারণ বাজারের অভিযোজন ক্ষমতা। নানা বাধা এড়িয়ে সরবরাহব্যবস্থা নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পেছনেও মূল ভূমিকা রেখেছে বেসরকারি খাত। মুক্তবাজারের এই সাফল্য সুরক্ষাবাদের ক্ষতি অনেকটাই আড়াল করে দিচ্ছে। তাই বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে জনতুষ্টিবাদী নীতির জয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















