অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে ও বিদেশে নানা সেমিনার ও বিনিয়োগ সম্মেলনের মাধ্যমে বিনিয়োগ টানার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নিবন্ধনে বড় পতন
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডায় ৯৭০টি প্রকল্পে মোট ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ১ হাজার ৬৪টি প্রকল্পে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকার প্রস্তাব জমা পড়েছিল, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। প্রকল্পের সংখ্যাও কমেছে।

কভিড সময়ের চেয়েও দুর্বল চিত্র
কভিড-১৯ মহামারির সময়েও বিনিয়োগ নিবন্ধনের এমন নিম্নগতি দেখা যায়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯০৫টি প্রকল্পে ১ লাখ ৫ হাজার ২২৬ কোটি টাকার প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল। পরের বছর কভিডের মধ্যেও প্রকল্পসংখ্যা বাড়লেও টাকার অঙ্কে বিনিয়োগ কমেছিল। পরবর্তী দুই বছরে পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে আবার পতন শুরু হয়, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে আরও তীব্র হয়েছে।
দেশি বিনিয়োগের চিত্র
গত অর্থবছরে নিবন্ধিত মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের বড় অংশ এসেছে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। ৮০৯টি প্রকল্পে স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৫২ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সেবা খাত এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া কেমিক্যাল, বস্ত্র ও প্রকৌশল খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব এসেছে।
বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থা
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১৬১টি প্রকল্পে মোট ১৪ হাজার ২২ কোটি টাকার প্রস্তাব নিবন্ধন করেছেন। এসব প্রস্তাবের বেশিরভাগই কেমিক্যাল খাতে। প্রকৌশল, সেবা ও বস্ত্র খাতেও কিছু বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। তবে নতুন ইকুইটি মূলধনের প্রবাহ কমে গেছে। গত অর্থবছরে ইকুইটি মূলধন এসেছে ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম।

চীনের বিনিয়োগে বড় ধাক্কা
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস দেশ চীন। গত এক বছরে উচ্চপর্যায়ের সফর ও বিনিয়োগ সম্মেলন হলেও বাস্তবে চীনা বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে ৮৯ শতাংশ। একই সঙ্গে নিট এফডিআই প্রবাহও কমেছে। দেশভিত্তিক বিনিয়োগ প্রস্তাবের তালিকায় চীন ছাড়া আগের শীর্ষ দেশগুলো আর শীর্ষ পাঁচে নেই। গত অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে, এরপর রয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকং।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরীর মতে, টাকার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। তার সঙ্গে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ কী ধরনের সুবিধা দিচ্ছে, সেটিও বড় প্রশ্ন। অর্থনৈতিক অঞ্চলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং ওয়ানস্টপ সেবার সীমাবদ্ধতাও বিনিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি সফর ও বাস্তব ফল
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন দেশে সফর করলেও অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে। কিছু দেশ থেকে নতুন প্রস্তাব আসেনি, আবার কোথাও নিট এফডিআই হ্রাস পেয়েছে। ফলে কেবল সফর ও প্রচারণা দিয়ে বিনিয়োগ টানা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রূপান্তরকালীন সময়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা স্বাভাবিক। তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত ছিল বাস্তব সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং অতিরঞ্জিত ইতিবাচক চিত্র না দেখানো। বাস্তবতা স্বীকার করেই আস্থা তৈরির চেষ্টা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের অপেক্ষা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী নির্বাচিত নতুন সরকারের দিকেই তাকিয়ে আছেন। তবে নির্বাচন হলেই যে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়বে, সেটিও নিশ্চিত নয়।
বিডার ব্যাখ্যা
বিডার দাবি, বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ কমলেও এটি বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প বাছাইয়ের ফল। সংস্থাটি বলছে, আগের বছরের তুলনায় বাস্তবায়িত বিনিয়োগের হার বেড়েছে এবং যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হয়েছে। বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচির মতে, এই পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে নতুন অর্থবছরের এফডিআই প্রবাহে দেখা যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















