০৪:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে সন্দেহ, ইরান ইস্যুতে সেনেটরদের ভিন্ন সুর ট্রাম্পের তেল হুমকির মুখে কিউবা, ভেনেজুয়েলা নির্ভরতা কাটাতে মরিয়া হাভানা ইরানে বিক্ষোভে পাঁচ শতাধিক প্রাণহানি, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ হলে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি তেহরানের সন্ন্যাসীর মতো শৃঙ্খলা, ঘাম আর আত্মসংযমে প্রিন্স নাসিম হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্র আঘাত হানলে পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানের, বিক্ষোভে উত্তাল ইরান পডকাস্টের মঞ্চে গ্ল্যামারের ঢেউ, গোল্ডেন গ্লোবসের নতুন বাজি ভেনেজুয়েলার পতনের পাঠ: গণতন্ত্র থেকে একনায়কতন্ত্রে যাওয়ার ছয়টি বই ওয়েলনেসের ছত্রাক জোয়ার: সুস্থতার খোঁজে মাশরুমের নতুন উন্মাদনা সত্তরের দশকের সন্ত্রাসের ইতিহাস: আদর্শ থেকে নৃশংসতায় রূপান্তরের এক ভয়াবহ দলিল তারার শক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা নিভে গেলেন গুলিতে

সত্তরের দশকের সন্ত্রাসের ইতিহাস: আদর্শ থেকে নৃশংসতায় রূপান্তরের এক ভয়াবহ দলিল

সত্তরের দশক ছিল বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক অস্থির ও রক্তাক্ত সময়। যুদ্ধ, বিপ্লব আর আদর্শিক সংঘাতের ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছিল এমন এক ধরনের সন্ত্রাস, যা কেবল রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেনি, সাধারণ মানুষের জীবনকেও পরিণত করেছিল অনিশ্চিত ও ভীতিকর এক বাস্তবতায়। সেই সময়ের সহিংস রাজনীতি, বিমান ছিনতাই, বোমা হামলা আর গুপ্ত হত্যার বিস্তৃত ইতিহাস তুলে ধরেছে এক সাম্প্রতিক গ্রন্থ, যেখানে উঠে এসেছে সন্ত্রাসের উত্থান, বিস্তার ও ধীরে ধীরে রূপ বদলের কাহিনি।

ফিলিস্তিনি প্রশ্ন ও সশস্ত্র প্রতিবাদের সূচনা

উনিশ শত সাতষট্টি সালের ছয় দিনের যুদ্ধে আরব বাহিনীর পরাজয়ের পর লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। সেই মানবিক বিপর্যয়ের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যেই উনিশ শত ঊনসত্তর সালে এক ফিলিস্তিনি বামপন্থি সশস্ত্র সংগঠন রোম থেকে তেলআবিবগামী একটি বিমান ছিনতাই করে। দামেস্কে অবতরণের পর যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে বিমানটি উড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার মুখ হয়ে ওঠেন এক তরুণী নারী যোদ্ধা, যাঁর ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের এক রোমান্টিক প্রতীক তৈরি করে। পরের বছর আরেকটি বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, সহযোদ্ধা নিহত হন, তিনি নিজে আহত হন এবং পরে বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পান।

Six-Day War | Definition, Causes, History, Summary, Outcomes, & Facts |  Britannica

একাধিক বিমান ছিনতাই ও অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ

এই সাহসী কিন্তু বিপজ্জনক কৌশলের পেছনে ছিলেন সংগঠনের এক প্রভাবশালী নেতা। একই সময়ে একাধিক বিমান ছিনতাই করে মরুভূমির একটি পরিত্যক্ত স্থানে নামানো হয়। টেলিভিশনের পর্দায় একের পর এক বিমান উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য সারা বিশ্বে সম্প্রচারিত হয়। এর প্রভাব ছিল গভীর ও ভয়াবহ। সশস্ত্র সহিংসতাকে খ্যাতি পাওয়ার পথ হিসেবে দেখে এক নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয়। এই ঘটনাগুলোই জর্ডানে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।

আন্তর্জাতিক বিপ্লবী নেটওয়ার্কের বিস্তার

গ্রন্থটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই থেমে থাকেনি। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা চরমপন্থি সংগঠনগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনি আন্দোলনের যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে। ইউরোপের তরুণ বিপ্লবীরা প্রশিক্ষণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের শিবিরে ছুটে যেতেন। ঠান্ডা যুদ্ধের বাস্তবতায় সোভিয়েত শিবির ও পশ্চিমা বিশ্বের দ্বন্দ্ব তাদের চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্যে পরিবর্তন আসে। শুরুতে রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী লক্ষ্য থাকলেও ধীরে ধীরে সহিংসতা নিজেই হয়ে ওঠে উদ্দেশ্য।

Soviet–Afghan War - Wikipedia

ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ধর্মীয় উগ্রতার পথে

সত্তরের দশকের শুরুতে এসব সংগঠন প্রকাশ্যে ধর্মীয় ছিল না। কিন্তু ইরানি বিপ্লব ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর সহিংস ধর্মীয় মতাদর্শ শক্তিশালী হতে থাকে। এই পরিবর্তনই পরবর্তী দশকগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

রাষ্ট্রের নরম অবস্থান ও কঠোর প্রতিক্রিয়ার সূচনা

প্রথম দিকে বহু সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা করে জিম্মি মুক্ত করত, নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দিত এবং মুক্তিপণ পরিশোধ করত। বিমানবন্দর নিরাপত্তা ছিল দুর্বল। কিন্তু উনিশ শত বাহাত্তর সালে অলিম্পিক আসরে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সবকিছু বদলে দেয়। ব্যর্থ উদ্ধার অভিযানে জিম্মিরা নিহত হলে রাষ্ট্রগুলো কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে। বিশেষ বাহিনীর অভিযান, জিম্মি উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমনের নতুন যুগ শুরু হয়।

Opinion | The New Radicalization of the Internet - The New York Times

সন্ত্রাসের মুখচ্ছবি ও ব্যক্তিগত নৃশংসতা

এই ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সন্ত্রাসী নেতাদের চরিত্রচিত্রণ। কেউ ছিলেন বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত, কেউ অহংকারী ও নিষ্ঠুর, আবার কেউ ক্ষমতা ও খ্যাতির মোহে অন্ধ। তাদের ব্যক্তিগত জীবন, সহিংসতা আর আত্মমুগ্ধতা দেখিয়ে দেয় আদর্শের আড়ালে কতটা নৃশংসতা লুকিয়ে ছিল। কারও জীবন শেষ হয়েছে গোপন বিস্ফোরণে, কেউ ধরা পড়ে আজীবন কারাবন্দি।

উত্তরাধিকার ও আজকের বাস্তবতা

এই সন্ত্রাসীরা বিশ্বাস করত সহিংস কর্মই সমাজ বদলের বার্তা ছড়িয়ে দেবে। কিন্তু রাষ্ট্রের শক্তি ও সময়ের সঙ্গে তারা হয় নিহত হয়েছে, নয়তো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। তাদের উত্তরসূরিরা আরও ভয়াবহ। পরাজয়ের পরও নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। অনলাইনে নিজে নিজে উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়া মানুষজন এখনও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। একমাত্র পরিবর্তন হলো, সহিংসতার রূপ বদলালেও ভয় আর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে একই।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে সন্দেহ, ইরান ইস্যুতে সেনেটরদের ভিন্ন সুর

সত্তরের দশকের সন্ত্রাসের ইতিহাস: আদর্শ থেকে নৃশংসতায় রূপান্তরের এক ভয়াবহ দলিল

০২:৩৩:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

সত্তরের দশক ছিল বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক অস্থির ও রক্তাক্ত সময়। যুদ্ধ, বিপ্লব আর আদর্শিক সংঘাতের ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছিল এমন এক ধরনের সন্ত্রাস, যা কেবল রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেনি, সাধারণ মানুষের জীবনকেও পরিণত করেছিল অনিশ্চিত ও ভীতিকর এক বাস্তবতায়। সেই সময়ের সহিংস রাজনীতি, বিমান ছিনতাই, বোমা হামলা আর গুপ্ত হত্যার বিস্তৃত ইতিহাস তুলে ধরেছে এক সাম্প্রতিক গ্রন্থ, যেখানে উঠে এসেছে সন্ত্রাসের উত্থান, বিস্তার ও ধীরে ধীরে রূপ বদলের কাহিনি।

ফিলিস্তিনি প্রশ্ন ও সশস্ত্র প্রতিবাদের সূচনা

উনিশ শত সাতষট্টি সালের ছয় দিনের যুদ্ধে আরব বাহিনীর পরাজয়ের পর লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। সেই মানবিক বিপর্যয়ের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যেই উনিশ শত ঊনসত্তর সালে এক ফিলিস্তিনি বামপন্থি সশস্ত্র সংগঠন রোম থেকে তেলআবিবগামী একটি বিমান ছিনতাই করে। দামেস্কে অবতরণের পর যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে বিমানটি উড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার মুখ হয়ে ওঠেন এক তরুণী নারী যোদ্ধা, যাঁর ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের এক রোমান্টিক প্রতীক তৈরি করে। পরের বছর আরেকটি বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, সহযোদ্ধা নিহত হন, তিনি নিজে আহত হন এবং পরে বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পান।

Six-Day War | Definition, Causes, History, Summary, Outcomes, & Facts |  Britannica

একাধিক বিমান ছিনতাই ও অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ

এই সাহসী কিন্তু বিপজ্জনক কৌশলের পেছনে ছিলেন সংগঠনের এক প্রভাবশালী নেতা। একই সময়ে একাধিক বিমান ছিনতাই করে মরুভূমির একটি পরিত্যক্ত স্থানে নামানো হয়। টেলিভিশনের পর্দায় একের পর এক বিমান উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য সারা বিশ্বে সম্প্রচারিত হয়। এর প্রভাব ছিল গভীর ও ভয়াবহ। সশস্ত্র সহিংসতাকে খ্যাতি পাওয়ার পথ হিসেবে দেখে এক নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয়। এই ঘটনাগুলোই জর্ডানে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।

আন্তর্জাতিক বিপ্লবী নেটওয়ার্কের বিস্তার

গ্রন্থটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই থেমে থাকেনি। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা চরমপন্থি সংগঠনগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনি আন্দোলনের যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে। ইউরোপের তরুণ বিপ্লবীরা প্রশিক্ষণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের শিবিরে ছুটে যেতেন। ঠান্ডা যুদ্ধের বাস্তবতায় সোভিয়েত শিবির ও পশ্চিমা বিশ্বের দ্বন্দ্ব তাদের চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্যে পরিবর্তন আসে। শুরুতে রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী লক্ষ্য থাকলেও ধীরে ধীরে সহিংসতা নিজেই হয়ে ওঠে উদ্দেশ্য।

Soviet–Afghan War - Wikipedia

ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ধর্মীয় উগ্রতার পথে

সত্তরের দশকের শুরুতে এসব সংগঠন প্রকাশ্যে ধর্মীয় ছিল না। কিন্তু ইরানি বিপ্লব ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর সহিংস ধর্মীয় মতাদর্শ শক্তিশালী হতে থাকে। এই পরিবর্তনই পরবর্তী দশকগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

রাষ্ট্রের নরম অবস্থান ও কঠোর প্রতিক্রিয়ার সূচনা

প্রথম দিকে বহু সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা করে জিম্মি মুক্ত করত, নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দিত এবং মুক্তিপণ পরিশোধ করত। বিমানবন্দর নিরাপত্তা ছিল দুর্বল। কিন্তু উনিশ শত বাহাত্তর সালে অলিম্পিক আসরে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সবকিছু বদলে দেয়। ব্যর্থ উদ্ধার অভিযানে জিম্মিরা নিহত হলে রাষ্ট্রগুলো কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে। বিশেষ বাহিনীর অভিযান, জিম্মি উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমনের নতুন যুগ শুরু হয়।

Opinion | The New Radicalization of the Internet - The New York Times

সন্ত্রাসের মুখচ্ছবি ও ব্যক্তিগত নৃশংসতা

এই ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সন্ত্রাসী নেতাদের চরিত্রচিত্রণ। কেউ ছিলেন বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত, কেউ অহংকারী ও নিষ্ঠুর, আবার কেউ ক্ষমতা ও খ্যাতির মোহে অন্ধ। তাদের ব্যক্তিগত জীবন, সহিংসতা আর আত্মমুগ্ধতা দেখিয়ে দেয় আদর্শের আড়ালে কতটা নৃশংসতা লুকিয়ে ছিল। কারও জীবন শেষ হয়েছে গোপন বিস্ফোরণে, কেউ ধরা পড়ে আজীবন কারাবন্দি।

উত্তরাধিকার ও আজকের বাস্তবতা

এই সন্ত্রাসীরা বিশ্বাস করত সহিংস কর্মই সমাজ বদলের বার্তা ছড়িয়ে দেবে। কিন্তু রাষ্ট্রের শক্তি ও সময়ের সঙ্গে তারা হয় নিহত হয়েছে, নয়তো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। তাদের উত্তরসূরিরা আরও ভয়াবহ। পরাজয়ের পরও নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। অনলাইনে নিজে নিজে উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়া মানুষজন এখনও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। একমাত্র পরিবর্তন হলো, সহিংসতার রূপ বদলালেও ভয় আর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে একই।