পর্তুগালের ছোট শহর ভিসেউতে বেড়ে ওঠা এক কিশোর খুব অল্প বয়সেই ঠিক করে ফেলেছিল, সে বিজ্ঞানী হবে। সহপাঠীরা যখন পুলিশ কিংবা দমকলকর্মী হওয়ার স্বপ্ন দেখত, তখন তার চোখ ছিল তারার দিকে। সেই কিশোরই একদিন হয়ে ওঠেন নুনো লোরেইরো—নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণার অগ্রদূত, যাঁর অকালমৃত্যু বিশ্ববিজ্ঞানকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ হয়ে মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
ভিসেউ থেকে বিশ্বের শীর্ষ গবেষণাগার
শৈশবে কোনো বিজ্ঞানীর সংস্পর্শে না এসেও নুনো লোরেইরোর মনে বিজ্ঞানী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা দানা বাঁধে। তাঁর মা ছিলেন ফরাসি ভাষার শিক্ষক, বাবা শহরের আদালতের কৌঁসুলি। পরিবারে বিজ্ঞানের সরাসরি চর্চা না থাকলেও সতেরো বছর বয়সের মধ্যেই তিনি স্থির করেন, জীবন উৎসর্গ করবেন পদার্থবিদ্যায়। লিসবনের ইনস্টিটুতো সুপেরিয়র টেকনিকে পড়াশোনা শেষে তিনি পাড়ি জমান লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে। পরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে যোগ দিয়ে তিনি নিজের গবেষণাকে নিয়ে যান এক নতুন উচ্চতায়।

প্লাজমা, তারার মতো উত্তাল এক জগৎ
নুনো লোরেইরোর গবেষণার কেন্দ্র ছিল প্লাজমা—পদার্থের চতুর্থ অবস্থা, যেখানে আয়ন ও ইলেকট্রনের অতিতপ্ত মিশ্রণে তৈরি হয় মহাবিশ্বের প্রায় সব দৃশ্যমান বস্তু। এই প্লাজমাই গড়ে তোলে নক্ষত্র, আবার এর ভেতরের অশান্ত প্রবাহ সৃষ্টি করে বিপুল শক্তি। তিনি প্লাজমাকে তুলনা করতেন সাগরের ঢেউ কিংবা সকালের কফিতে দুধ নেড়েচেড়ে ওঠা ঘূর্ণির সঙ্গে, যদিও সেই ঘূর্ণি মহাজাগতিক মাত্রায় বিস্তৃত।
সূর্যের বাতাস থেকে পৃথিবীর শক্তির স্বপ্ন
সূর্য থেকে নির্গত কণার প্রবাহ, যাকে বলা হয় সৌরবায়ু, ছিল তাঁর প্রিয় গবেষণাক্ষেত্র। এই সৌরবায়ুর হঠাৎ তীব্র প্রবাহে যোগাযোগ উপগ্রহ বিঘ্নিত হয়, আকাশে দেখা দেয় মেরুজ্যোতি, আর মুক্তি পায় বিপুল শক্তি—যা এক দিনে একটি পুরো দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে পারে। ইম্পেরিয়াল কলেজে তাঁর গবেষণাপত্রে প্লাজমার ছিন্নভিন্ন হয়ে আবার যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে তাঁর আজীবনের কাজ।
ল্যাবরেটরি আর নক্ষত্রের মাঝে সেতুবন্ধন

প্লাজমা গবেষণায় নুনো লোরেইরো দেখতেন দুই ভিন্ন জগতের মিলন। একদিকে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার বিশাল পরিসর, অন্যদিকে পরীক্ষাগারের ডোনাটের মতো আকৃতির রিয়্যাক্টর, যেখানে চুম্বকের সাহায্যে কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রার প্লাজমাকে স্থির রাখার চেষ্টা চলে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সূর্যের মতো ফিউশন শক্তি যদি পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে তেল আর কয়লার প্রয়োজন ছাড়াই মানবসভ্যতা পেতে পারে অবিরাম শক্তির উৎস।
শিক্ষক হিসেবে অনুপ্রেরণা
শ্রেণিকক্ষে ঢুকতেন হাসিমুখে, বোর্ড ভরে উঠত অঙ্ক আর সমীকরণে। বন্ধুর মতো রসিকতা করলেও শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমে কোনো ছাড় দিতেন না। তিনি বলতেন, ব্যর্থতাকে ভয় পেও না, কারণ কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হলেই ব্যর্থতা আসে। তিনি স্মরণ করিয়ে দিতেন সিসিফাসের উপকথা—চূড়ায় পাথর ঠেলাই যেখানে শেষ পর্যন্ত সাফল্যের প্রতীক।
পুরস্কার, স্বীকৃতি আর অসমাপ্ত পথ

তাঁর ঝুলিতে আসে একাধিক সম্মাননা, যার মধ্যে তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত পুরস্কার ছিল উল্লেখযোগ্য। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বনমুক্ত শক্তির সমর্থকেরা তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন আশায়। তবু তিনি স্বীকার করতেন, নির্ভরযোগ্য ফিউশন শক্তি এখনও দূরের স্বপ্ন। ধীরে ধীরে, ক্ষুদ্র পদক্ষেপেই এগোতে হবে।
হিংসার অন্ধকারে নিভে যাওয়া আলো
লিসবনে পড়াশোনার সময় তাঁর এক সহপাঠী ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। বহু বছর পর সেই মানুষটি ফিরে এসে এক ভয়াবহ সহিংসতার পথে হাঁটে। গত ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলাইনে নুনো লোরেইরোর বাসভবনে গুলি চালানো হয়। হামলার স্পষ্ট উদ্দেশ্য কখনো জানা যায়নি। পেশাগত হিংসা থেকে শুরু করে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ঘুরে বেড়ালেও সত্য থেকে গেল অজানা।

তারার শক্তি আর মানুষের নিয়তি
নুনো লোরেইরোর গবেষণা যেন শেষ পর্যন্ত এক নির্মম প্রতীকে রূপ নিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের বিস্ফোরণ সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, সবসময় ব্যাখ্যাও করা যায় না। তাঁর জীবন ও মৃত্যু যেন সেই কথারই প্রতিধ্বনি, যেখানে মানুষের জ্ঞান আর অজানার শক্তি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















