সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর থেকেই যে মানুষটি ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর গুপ্তচর সংস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তিনি ছিলেন ভাসিলি মিত্রোখিন। পেশায় সাধারণ কেরানি, অথচ সাহসে অনন্য। রাশিয়া কীভাবে ভয়, সন্দেহ আর রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতারণার দেশে পরিণত হয়েছিল, সেই গল্পই নতুন করে সামনে এনেছেন তাঁর জীবনকথা।
ভয় আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিত
সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ দশকগুলো ছিল গভীর অবিশ্বাসের সময়। আফগানিস্তান যুদ্ধ একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করেছিল, চেরনোবিল দুর্ঘটনা উন্মোচন করেছিল শাসকদের অবহেলা ও অযোগ্যতা। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল নিরাপত্তা আর নজরদারির আতঙ্ক। এই বাস্তবতার মাঝেই কেজিবি হয়ে উঠেছিল সোভিয়েত ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ। নাগরিকদের উৎসাহ দেওয়া হতো একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে, লেখক ও শিল্পীদের মুখ বন্ধ করা হতো দেশপ্রেমের নামে।
মিত্রোখিনের জাগরণ
এই দমবন্ধ করা পরিবেশেই ভাসিলি মিত্রোখিনের বিবেক জেগে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করতেন, লেনিনের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতালোভী শাসকেরা যে অন্যায় চালাচ্ছে, তা মানুষের জানা উচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কেজিবিতে যোগ দিলেও বিদেশি পোস্টিংয়ে ব্যর্থতার পর তাঁকে মস্কোতে ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানেই তাঁর দায়িত্ব পড়ে কেজিবির বিদেশি গুপ্তচর শাখার গোপন নথি সংরক্ষণে।
নথির ভেতর লুকোনো বিপ্লব
বছরের পর বছর ধরে মিত্রোখিন গোপনে নথির অনুলিপি করতে থাকেন। জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তিনি এসব তথ্য লুকিয়ে রাখেন দুধের পাত্রে। অবশেষে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে লাতভিয়ায় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দেন সেই গোপন ভাণ্ডার। সোভিয়েত রাষ্ট্রের চোখ এড়িয়ে তিনি পরিবারসহ দেশ ছাড়েন।
প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ফাঁক
এই নথি প্রকাশের পর কয়েকটি গ্রেপ্তার হলেও মিত্রোখিন যে নৈতিক জাগরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। কেজিবি নতুন নামে ফিরে আসে, আর রাশিয়ায় আবার মাথা তোলে সাম্রাজ্যবাদী দম্ভ। ভ্লাদিমির পুতিনের উত্থান, চেচনিয়া যুদ্ধ আর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রমাণ করে দেয়, রাষ্ট্রযন্ত্র খুব সহজে বদলায় না।
নির্বাসনে একাকিত্ব
পশ্চিমে কাটানো মিত্রোখিনের বছরগুলো সুখের ছিল না। পারিবারিক দূরত্ব, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী সন্তানের দায়িত্ব আর সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল নিজের দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা। সাম্যবাদ পরবর্তী রাশিয়ায় ধনী শ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল ভোগ আর দরিদ্র মানুষের দুর্দশা তাঁকে আরও ভেঙে দেয়।
ব্যর্থতা নাকি সতর্কবার্তা
এক অর্থে মিত্রোখিন ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি কেজিবিকে ধ্বংস করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর জীবন এক ভিন্ন সত্য তুলে ধরে। একা একজন মানুষও ইতিহাসে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারে। আজকের রাশিয়ার ক্ষমতা, সম্পদ আর দমননীতির ভিত্তি বুঝতে গেলে মিত্রোখিনের গল্প এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

ইতিহাসের শেষ অধ্যায়
আশির দশকের শুরুতে পারমাণবিক উত্তেজনা আর সামরিক মহড়ার ভুল ব্যাখ্যা সোভিয়েত ব্যবস্থার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। কিন্তু ভাসিলি মিত্রোখিনের প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে। বিবেকের ভিত্তি নষ্ট হলে একটি রাষ্ট্র কতটা অমানবিক হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















