ভবিষ্যৎ জানার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা যখন অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল পূর্বাভাস নয়, বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। ইভেন্ট ভিত্তিক প্রেডিকশন মার্কেট এখন ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। জুয়া আর বিনিয়োগের মাঝামাঝি ধূসর এক পরিসরে কাজ করা এই প্ল্যাটফর্মগুলো ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের বিশ্বাসকে রূপ দিচ্ছে সংখ্যায়, আর সেই সংখ্যা আবার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে দামের খেলায় কোটি টাকার বাজি
সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক মিলিয়ন ডলারের বেশি বাজি পড়েছে। ইরানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার ক্ষমতাচ্যুতি নিয়ে সম্ভাবনার হার অল্প সময়ের মধ্যে দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে। ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ব্যবসায়ী বিপুল অর্থ বাজি ধরে অল্প সময়ে কয়েক লাখ ডলার মুনাফা করেছেন, যদিও পরে সেই অর্থ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এসব উদাহরণ দেখাচ্ছে, প্রেডিকশন মার্কেট এখন আর কৌতূহলের খেলা নয়, এটি বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

সম্ভাবনা কীভাবে ক্ষমতায় রূপ নেয়
এই বাজারে অংশগ্রহণকারীরা নির্দিষ্ট ঘটনার পক্ষে বা বিপক্ষে শেয়ার কেনেন। এক ডলারের ভেতরে ওঠানামা করা এই দামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ঘটনার সম্ভাবনার হার। কোনো ঘটনার পক্ষে দাম যত বাড়ে, ততই মনে করা হয় সেটি ঘটার সম্ভাবনা বেশি। তথ্য বদলালে দাম বদলায়, আর সেই দামের ওঠানামা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সংবাদ কক্ষ এবং নীতিনির্ধারণী মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে সম্ভাবনা আর কেবল প্রতিফলন নয়, তা নিজেই প্রত্যাশা তৈরি করতে শুরু করে।
অর্থনীতিবিদদের প্রশংসা আর বাস্তবের প্রশ্ন
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই বাজার ছড়িয়ে থাকা তথ্য একত্র করে তুলনামূলকভাবে নির্ভুল পূর্বাভাস দেয়। অতীতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদরাও বলেছেন, প্রথাগত জরিপ বা পূর্বাভাসের তুলনায় এই বাজার অনেক সময় কম ভুল করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মুদ্রাস্ফীতি বা নির্বাচনের মতো ক্ষেত্রে প্রেডিকশন মার্কেট প্রায়ই বিশেষজ্ঞদের ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এই পারফরম্যান্স আরও স্পষ্ট।
ঝুঁকি, কারসাজি আর ভিড়ের প্রভাব

তবে এই বাজার আর পাঁচটা আর্থিক বাজারের মতোই ঝুঁকিমুক্ত নয়। কম লেনদেন হওয়া বাজারে কারসাজির সুযোগ থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইচ্ছাকৃতভাবে দামের ধাক্কা দিলে তার প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। আবার কোনো একটি গল্প বা বিশ্বাস জনপ্রিয় হয়ে উঠলে মানুষ একের পর এক একই দিকে বাজি ধরতে শুরু করে। এতে বাস্তবতার চেয়ে প্রত্যাশা বড় হয়ে ওঠে, তৈরি হয় আত্মপূরণকারী ভবিষ্যদ্বাণী।
নিয়ন্ত্রণহীনতায় নিয়ন্ত্রকদের উদ্বেগ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। প্রচলিত ডেরিভেটিভ বা আর্থিক পণ্যের মতো এখানে এখনো স্পষ্ট নজরদারি, প্রকাশ্য তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কিংবা পুঁজির সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে কোন সংস্থা দেখভাল করবে, এগুলো জুয়া নাকি আর্থিক পণ্য, সেই বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশ আবার সরাসরি এই ধরনের বাজারকে অবৈধ জুয়া হিসেবে দেখছে।

কর আর নীতির জটিল সমীকরণ
কর আরোপ নিয়েও রয়েছে দ্বিধা। জুয়ার মতো কর বসালে বাজার আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। আবার খুব কম কর আরোপ করলে নির্বাচন বা জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়েও অতিরিক্ত জল্পনা উৎসাহিত হতে পারে। ফলে রাজস্ব, নৈতিকতা আর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যৎ দেখার আয়না না কি ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার
প্রেডিকশন মার্কেট ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মূল্যবান ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তা ভবিষ্যৎ কে প্রভাবিত করতে পারে। সম্ভাবনার হার যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা মানুষের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। এই প্রতিক্রিয়াশীল ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে পূর্বাভাসের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা বড় হয়ে উঠবে। তাই বিশ্বাসযোগ্যতা গড়তে শুধু সঠিক পূর্বাভাস নয়, প্রয়োজন বিচক্ষণ নজরদারি ও স্পষ্ট নিয়ম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















