রাজধানীজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির তীব্র সংকট ঘরোয়া রান্নাঘর থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক খাবারের দোকান পর্যন্ত মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলছে। অনিয়মিত সরবরাহ ও বাড়তি দামের চাপে নিত্যদিনের জীবন ও জীবিকা দুটিই কঠিন হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের নিত্য সংগ্রাম
প্রায় দুই দশক ধরে ঢাকায় মাঝারি মানের একটি হোটেল চালিয়ে আসছেন আবদুল্লাহ মোল্লা। অফিসপাড়া, শিক্ষার্থী ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী খাবারই ছিল তাঁর মূল ভরসা। তবে গত দুই সপ্তাহ ধরে হোটেল চালানো যেন প্রতিদিনের যুদ্ধ।
তিনি জানান, বেশি দাম দিয়েও সময়মতো গ্যাস সিলিন্ডার মিলছে না। অনেক দিন পুরো মেনু চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে লোকসান বাড়ছে, খালি পেটে ফিরে যাচ্ছেন ক্রেতারা। রান্নাঘর বন্ধ করাও সম্ভব নয়, কিন্তু গ্যাস না থাকায় বেশ কয়েকটি খাবার ইতিমধ্যে বাদ দিতে হয়েছে।
এই সংকটে শুধু বড় হোটেল নয়, ছোট রেস্তোরাঁ ও ভাসমান খাবার বিক্রেতারাও বিপদে পড়েছেন। ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় ফাস্টফুড কার্ট চালানো কাদের জানান, এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিনের খরচ অনেক বেড়েছে। খাবারের দাম বাড়ালে ক্রেতারা বিরক্ত হন, আবার দাম না বাড়ালে লাভ থাকে না। ফলে অনেকেই কিছু না কিনেই চলে যাচ্ছেন।

গৃহিণীদের বাড়তি চাপ
এলপিজি সংকট শুধু ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়। শহরের বহু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় এলপিজিই একমাত্র রান্নার জ্বালানি। ফলে হাজারো পরিবারের দৈনন্দিন রান্না এখন অনিশ্চিত।
কিছু পরিবার বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, যা অধিক খরচসাপেক্ষ, সময়সাপেক্ষ ও ঝামেলাপূর্ণ। গৃহিণী আরহা মনি বলেন, তাঁদের এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস নেই বহুদিন ধরে। পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হয়, অথচ এখন সেটিও বিশৃঙ্খল।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত দাম ও দোকানিদের নেওয়া দামের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। বারো কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি দাম এক হলেও দোকানে তা দুই হাজার পাঁচশ থেকে দুই হাজার ছয়শ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, এটি ব্যবসা না লুটপাট।
তিনি আরও বলেন, কিছু ব্যবসায়ী সরকারি দাম উপেক্ষা করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁকা করা হচ্ছে, অথচ দেখার কেউ নেই। চুলায় গ্যাস নেই, সিলিন্ডার কিনতেও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।
ভোক্তারা মনে করছেন, বাজার তদারকির দুর্বলতার কারণেই এ ধরনের অনিয়ম চলছে। তাঁরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে সরকারি দামে বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

আমদানি নির্ভরতা ও সরবরাহ জটিলতা
এলপিজি বিপণন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা ও মূল্য সমন্বয় নিয়ে জটিলতা কাজ করছে। তাঁদের অভিযোগ, পরিস্থিতি খারাপ হলেও এখনো সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা বা দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে এলপিজির কোনো ঘাটতি নেই এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দুই হাজার পঁচিশ সালের নভেম্বর মাসে এক লাখ পাঁচ হাজার এবং ডিসেম্বর মাসে এক লাখ সাতাশ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আমদানি বাড়ার পরও বাজারে সংকটের যুক্তি নেই বলে দাবি করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতের সূত্র জানায়, দেশে বছরে প্রায় চৌদ্দ লাখ মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। মাসিক গড় ব্যবহার এক লাখ বিশ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। শীত ও উৎসবের সময় এই চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
দেশের প্রায় আটানব্বই শতাংশ এলপিজি আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক দামের ওঠানামা, ডলার সংকট, ঋণপত্র খোলার জটিলতা ও জাহাজ বিলম্বের প্রভাব সরাসরি পড়ে বাজারে। বিপণন কোম্পানিগুলো বলছে, সাম্প্রতিক আমদানি ব্যাহত হওয়ায় পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা যায়নি। ফলে অনেক এলাকায় ডিলাররা চাহিদার তুলনায় অনেক কম সিলিন্ডার পাচ্ছেন।
সরকারি দাম অপরিবর্তিত থাকলেও সংকটের সুযোগে বাজারে বারো কেজির সিলিন্ডার এক হাজার আটশ থেকে দুই হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই হাজার ত্রিশ সালের মধ্যে দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা আড়াই মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছাতে পারে। সরবরাহ সক্ষমতা না বাড়ালে, আমদানি প্রক্রিয়া সহজ না করলে এবং বাজার তদারকি জোরদার না হলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

স্বস্তির ইঙ্গিত কি
ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা এনেছে। জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরবরাহকারী বা ক্রেতা ঋণের আওতায় এখন সর্বোচ্চ দুইশ সত্তর দিনের বিলম্বিত পরিশোধ সুবিধা মিলবে। ডলার সংকটের সময় এটি আমদানিকারকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগবে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া এবং দাম না কমা পর্যন্ত হোটেল মালিক, খাবার বিক্রেতা ও গৃহিণীদের দুর্ভোগ চলতেই থাকবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব এ কে এম ফজলুল হক জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ষাট লাখ পরিবার এলপিজি ব্যবহার করে। তাই এটি একটি অত্যাবশ্যক পণ্য। তিনি বলেন, সরকার এলপিজি নীতিমালা হালনাগাদের কাজ করছে, যেখানে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে দিকনির্দেশনা থাকবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আসন্ন রমজানে এলপিজির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা নেই। জানুয়ারি মাসেই প্রায় দেড় লাখ টন এলপিজি দেশে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত আমদানিতে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















