ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনকে দ্রুত সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে, তবে প্রাথমিকভাবে সীমিত অধিকার নিয়ে। যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই ধারণার মূল লক্ষ্য। রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির সঙ্গে ইউক্রেনের ইইউ সদস্যপদ যুক্ত থাকতে পারে। ধাপে ধাপে ভোটাধিকার দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
ব্রাসেলস, ১৬ জানুয়ারি। ইউরোপীয় কমিশন রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করার উপায় নিয়ে ভাবছে। তবে প্রাথমিকভাবে কিয়েভকে পূর্ণ সদস্যপদের সব অধিকার না দিয়ে সীমিত অধিকার দেওয়ার কথা বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইইউ কর্মকর্তারা। পূর্ণ সদস্যপদের অধিকার পেতে হলে নির্ধারিত রূপান্তরকাল অতিক্রম করে তা অর্জন করতে হবে।

এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা এই ধারণাটি মূলত ইউক্রেনীয়দের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ভাবা হচ্ছে। চার বছর ধরে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর ইউক্রেন ইউরোপের কাছ থেকে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি চায়। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পথে তারা রয়েছে—এমন স্পষ্ট বার্তা দেওয়াই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
কূটনীতিকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আলোচিত একটি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনায় ২০২৭ সালে ইউক্রেনের ইইউ সদস্যপদের সম্ভাব্য সময় উল্লেখ করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ শেষ হলে ইউক্রেনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
তবে ইইউর অনেক সরকারই মনে করে, ওই তারিখ বা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ইইউতে যোগদান একটি যোগ্যতাভিত্তিক প্রক্রিয়া, যেখানে কেবল তখনই অগ্রগতি হয়, যখন কোনো দেশ তার আইন ও নীতিকে ইইউ মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পারে। পাশাপাশি ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের জাতীয় সংসদের অনুমোদনও প্রয়োজন।

ইইউ কর্মকর্তাদের প্রস্তাবিত ধারণায় ঐতিহ্যগত প্রক্রিয়ার উল্টো পথ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে সীমিত সদস্যপদ হলেও ইইউ সরকার ও জাতীয় সংসদগুলোর সম্মতি অপরিহার্য থাকবে।
একজন ইইউ কর্মকর্তা বলেন, আমরা স্বীকার করি যে সদস্যপদের নিয়ম তৈরি হওয়ার সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বড় পার্থক্য রয়েছে।
এই ধারণা অনুযায়ী, ইউক্রেন এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রার্থী দেশ দ্রুত ইইউতে যোগ দিতে পারবে। এরপর পূর্ণ সদস্যপদের শর্ত পূরণে তাদের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে ভোটাধিকারসহ অন্যান্য অধিকার দেওয়া হবে।
দীর্ঘ আলোচনা ও বাস্তবতা
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেন পূর্ণমাত্রার রুশ আগ্রাসনের মুখে। ওই বছরের জুনে দেশটি ইইউ প্রার্থী মর্যাদা পায় এবং ২০২৩ সালের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়।
সাধারণত এই আলোচনা বহু বছর ধরে চলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউক্রেনের মতো জনসংখ্যার দেশ পোল্যান্ড যুদ্ধ ছাড়াই প্রায় ১০ বছর সময় নিয়ে ২০০৪ সালে ইইউতে যোগ দেয়।

তবে ইউরোপীয় কমিশনের ভেতরে কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে ইউক্রেনের হাতে এত সময় নেই। কারণ রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে কিয়েভকে ভূখণ্ড ছাড় দিতে হতে পারে, যা গণভোটে ইউক্রেনীয়দের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
ইইউ সদস্যপদ, যদিও সীমিত, তবু এমন চুক্তিকে কিছুটা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে এবং পূর্ণ অধিকার পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করার মতো স্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
একজন ইইউ কূটনীতিক বলেন, আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই ইউক্রেনকে ইইউতে অন্তর্ভুক্ত করা ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইউক্রেনকে দ্রুত ইইউতে নেওয়ার জন্য সৃজনশীল সমাধান খুঁজতে হবে। উল্টো প্রক্রিয়ার এই সদস্যপদ ধারণা সেই চিন্তারই প্রতিফলন—প্রথমে রাজনৈতিকভাবে ইইউতে অন্তর্ভুক্তি, পরে শর্ত পূরণ হলে পূর্ণ অধিকার।
ইতিহাস বলছে, প্রথম দিনেই পূর্ণ অধিকার না পাওয়া নতুন কিছু নয়। ২০০৪ সালের সম্প্রসারণের পর অনেক দেশকেই দীর্ঘ রূপান্তরকাল পার করতে হয়েছে, যেমন ইইউজুড়ে কাজের অধিকার পেতে।
তবে বর্তমানে যে মডেল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাতে আরও ব্যাপক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এতে ইউক্রেনের বাইরেও অনেক প্রশ্ন উঠবে এবং সর্বসম্মত সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে।
দ্বিতীয় এক ইইউ কর্মকর্তা বলেন, এটি বিক্রি করা কঠিন হবে। যারা ঐতিহ্যগত পথে সব শর্ত পূরণ করে সদস্যপদের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যেমন মন্টেনেগ্রো বা আলবেনিয়া, তাদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















