২০২২ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের উভালদে শহরের রব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যা ঘটেছিল, তা শুধু একটি গণহত্যা নয়, বরং রাষ্ট্রের ব্যর্থতারও প্রতীক হয়ে আছে। এক কিশোর স্কুলে ঢুকে গুলি চালানোর পর একটি শ্রেণিকক্ষে নিজেকে আটকে রাখে। সেই সময় পুলিশের বডিক্যামের ফুটেজে দেখা যায়, কর্মকর্তারা করিডরে দাঁড়িয়ে কোন কক্ষে হামলাকারী আছে তা নিয়ে বিভ্রান্ত। অথচ ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক দশ বছরের ছাত্রী জরুরি নম্বরে ফোন করে জানাচ্ছিল সে কোন কক্ষে আছে। কাঁপা কণ্ঠে সে বলেছিল, দয়া করে তাড়াতাড়ি আসুন, চারদিকে লাশ। শিশুদের হাতে তখন কেবল চারুকলার কাঁচি, নিঃশব্দে বসে তারা মৃত্যুর অপেক্ষায়। শেষ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষ ভাঙা হয় সাতাত্তর মিনিট পর। ততক্ষণে উনিশ শিশু ও দুই শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন।
ঘটনার পর প্রায় চারশো কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু কেন এত দেরি হলো, কেন কেউ দ্রুত এগিয়ে গেল না, সেই প্রশ্নে আজও ক্ষুব্ধ উভালদের মানুষ। তিন বছর পর অবশেষে দোষী খোঁজার চেষ্টা আইনের কাঠগড়ায় পৌঁছেছে। জানুয়ারির শুরুতে রাজ্য সরকার প্রথম দিকের এক পুলিশ কর্মকর্তা আদ্রিয়ান গঞ্জালেসের বিরুদ্ধে মামলা শুরু করে। অভিযোগ, শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখার উনত্রিশটি ধারা। এটি কোনো সরাসরি কাজের অভিযোগ নয়, বরং কিছু না করার অভিযোগ।

নিষ্ক্রিয়তা কি অপরাধ
ফৌজদারি আইনে সাধারণত মানুষ যা করে তার জন্য শাস্তি হয়, যা করে না তার জন্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রে তথাকথিত খারাপ সামারিটান আইন খুবই বিরল, আর থাকলেও সেগুলো প্রয়োগ করা হয় কম। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের আইন আচরণের চেয়ে চরিত্রকে বেশি শাস্তি দেয় এবং মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। তবু এই মামলায় রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে অভিযুক্ত কর্মকর্তা জেনে, বুঝে বা অবহেলায় এমন কিছু করেছেন বা করেননি, যার ফলে শিশুদের সামনে মৃত্যু ও গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
আইনে কার দায় আছে
আমেরিকান আইনে সাধারণত তিন শ্রেণির মানুষের ওপর কাজ করার দায় স্বীকৃত, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু অতীতে যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা সাধারণত অনেক বেশি প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ছিলেন। যেমন দীর্ঘদিন শিশুকে না খাইয়ে রাখা বা বিপজ্জনক বস্তু হাতের নাগালে রাখা। উভালদের ঘটনায় নজির খোঁজা কঠিন। আগের কিছু রায়ে আদালত বলেছে, রাষ্ট্র বা পুলিশ সব ক্ষেত্রে নাগরিককে রক্ষা করতে বাধ্য নয়, বিশেষ করে যখন তারা নিজে থেকে বিপদ সৃষ্টি করেনি।

ভয় ও দায়িত্বের সংঘাত
এই মামলার কেন্দ্রে রয়েছে একটি কঠিন প্রশ্ন, অপরাধ থামাতে গিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিজের জীবন কতটা ঝুঁকিতে ফেলতে হবে। প্রসিকিউশনের যুক্তি, দীর্ঘদিনের চাকরি ও সাম্প্রতিক সক্রিয় হামলা মোকাবিলার প্রশিক্ষণ থাকায় অভিযুক্ত কর্মকর্তার উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে ভবনে ঢুকে পড়া। কিন্তু হামলার পরপরই অনেক কর্মকর্তা বলেছেন, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে হামলাকারীর মুখোমুখি হওয়া মানে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু। টেক্সাসের আইন পুলিশকে শান্তি রক্ষা করতে বলে, আত্মঘাতী অভিযানে যেতে বাধ্য করে না, এমন যুক্তিও উঠে এসেছে।
চাপ, বিচার ও ভবিষ্যতের শঙ্কা
এই মামলা আদালত পর্যন্ত গড়ানোই প্রমাণ করে, ক্ষুব্ধ সমাজ অন্তত কাউকে দায়ী দেখতে চেয়েছে। কারণ শিশুদের হত্যাকারী নিজেই মারা গেছে। বিচার চলছে উভালদে থেকে অনেক দূরের এক আদালতে, যেখানে জুরি অভিযুক্ত কর্মকর্তার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন। যদি দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে এর প্রভাব সারা দেশে পড়তে পারে। নিষ্ক্রিয়তার জন্য কারাদণ্ড হলে ভবিষ্যতে কম মানুষই হয়তো জরুরি সেবায় আসতে চাইবে। একজন কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া উভালদের ক্ষত কিছুটা সারাতে পারে, কিন্তু পরের কোনো শহরকে এমন হামলার জন্য প্রস্তুত করবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















