০৬:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
নতুন উচ্চ রেজোলিউশন ছবিতে নোভার বিস্ফোরণ নিয়ে পুরোনো ধারণা নড়ল বক্স অফিসে ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’ এগিয়ে, ‘বোন টেম্পল’ পিছিয়ে ভূমিকম্পের পরও টিকে থাকার লড়াই ওয়াজিমার ল্যাকার শিল্প ২০২৬ সালে ঘরই হবে নিরাপদ আশ্রয়, ব্যক্তিত্বের ছাপে সাজাবে বাড়ি ড্রাগনের যুদ্ধ ছেড়ে মানুষের ভেতরের লড়াই, ওয়েস্টেরসের নীরব যুগে নতুন যাত্রা সংযুক্তিতে শক্তি, পরিবারে ভবিষ্যৎ টম ভারলেনের অজানা ভাণ্ডার খুলে গেল মৃত্যুর তিন বছর পর জনসমক্ষে নিউইয়র্ক রকের রহস্যময় কিংবদন্তি শিল্পের নদী বয়ে যাবে মরুভূমিতে, দুবাইয়ে দশ কিলোমিটার বিস্তৃত অভিজ্ঞতামূলক শিল্পযাত্রা শুরু নাটকীয় লড়াইয়ে দুবাই ইনভিটেশনাল জিতলেন এলভিরা, আবেগে ভাসা এক স্বপ্নপূরণ রোকিডের স্ক্রিনহীন স্মার্টগ্লাস হাতে মুক্ত এআই যুগের ইঙ্গিত

ভূমিকম্পের পরও টিকে থাকার লড়াই ওয়াজিমার ল্যাকার শিল্প

জাপানের নোটো উপদ্বীপের ছোট শহর ওয়াজিমা একসময় ল্যাকার শিল্পের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ঘরবাড়ি, কর্মশালা আর মানুষের জীবন মিলিয়ে পুরো শহরটাই যেন ছিল এক চলমান কারখানা। কিন্তু নববর্ষের দিনে ভয়াবহ ভূমিকম্প সেই শহরকে বদলে দিয়েছে চিরতরে। ঘর হারিয়েছেন কারিগররা, ধ্বংস হয়েছে শত শত স্টুডিও। তবুও হাতছাড়া হয়নি তাদের শিল্প, হার মানেনি ল্যাকার।

ধ্বংসস্তূপে হারানো ঘর আর স্মৃতি
ওয়াজিমার প্রখ্যাত ল্যাকার শিল্পী কাজুও ইয়ামাগিশির বর্তমান ঠিকানা কানাজাওয়ার একটি সাধারণ ফ্ল্যাট। কিন্তু তার আসল ঘর আজও বেঁচে আছে একটি ল্যাকার ট্রের ভেতরে। কালো পৃষ্ঠের ওপর সূক্ষ্ম লাল রেখা, সোনালি আর ঝিনুকের ঝিলিক তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় হারানো শহরের সমুদ্রতটে। সেখানে সন্ধ্যার আলো পড়ত জাপান সাগরের জলে। সেই শহরই ভূমিকম্পে ধুয়ে গেছে।

নতুন বছরের প্রথম দিনে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্পে আগুন, ভূমিধস আর ধসে পড়া ভবনে ওয়াজিমার প্রায় ষাট হাজার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ হারান দুই শতাধিক মানুষ। ভেঙে পড়ে সড়ক, স্কুল, বন্দর। কয়েক মাস পর প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। উপকূল ভেঙে গিয়ে শুকিয়ে যায় অনেক মাছ ধরার ঘাট।

ওয়াজিমা ল্যাকার কেন আলাদা
ওয়াজিমার ল্যাকার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিচিত তার টেকসই মানের জন্য। উরুশি গাছের রস আর স্থানীয় কাদামাটির সূক্ষ্ম গুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি এই ল্যাকার সরকারি স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী শিল্প। ভূমিকম্পের আগে শহরের প্রায় সাতশো কারিগর নিজের বাড়িতেই কাজ করতেন। পুরো শহরটাই যেন ছিল একে অপরের সঙ্গে যুক্ত স্টুডিও।

Artists Keep Ancient Japanese Craft Alive

অস্থায়ী স্টুডিওতে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ভূমিকম্পের পর জাপান সরকার অর্থ সহায়তায় তৈরি করেছে অস্থায়ী ল্যাকার স্টুডিও। ছোট এই ঘরগুলোতেই এখন কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন অনেক শিল্পী। হাজার হাজার অস্থায়ী ঘর তৈরি হলেও ওয়াজিমার শতাধিক ল্যাকার প্রতিষ্ঠানের খুব কমই ক্ষতির বাইরে ছিল। শহরের মেয়র জানিয়েছেন, আগের মতো কাজ করা এখন সম্ভব নয়, কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে উৎপাদন থামানোও যায় না।

শহরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় তেইশ হাজার। স্কুল আর খেলার মাঠ ধ্বংস হওয়ায় বহু পরিবার শহর ছেড়েছে। শিশুদের বড় অংশ আর ফেরেনি। কৃষি, মৎস্য আর পর্যটনের পাশাপাশি ল্যাকারই ছিল ওয়াজিমার পরিচয়। তাই ল্যাকার মানেই শহরের অস্তিত্ব।

ধীর শিল্পের দীর্ঘ সাধনা
ল্যাকার তৈরি সহজ কাজ নয়। একটি বাটি বা শিল্পকর্মে লাগে শতাধিক ধাপ। কাঠের গঠন থেকে শুরু করে একের পর এক স্তর বসাতে হয় ধৈর্য নিয়ে। চিংকিন, মাকি এ, রাদেনের মতো জটিল কৌশলে সোনা, রুপা আর ঝিনুক বসিয়ে তৈরি হয় নকশা। প্রতিটি স্তর শুকাতে লাগে আর্দ্রতা আর উষ্ণতা। এই গভীরতা আর আলোছায়ার খেলা কেবল ল্যাকারেই সম্ভব।

ক্ষয় আর স্মৃতির ভার
পঁচাশি বছর বয়সী শিল্পী ফুমিও মায়ে আজও চোখে ভাসান হারানো বাড়ির দৃশ্য। পরিবারের সঙ্গে নববর্ষের ভোজ চলাকালেই শুরু হয় কম্পন। আগুনে পুড়ে যায় ঘর, সঙ্গে হারিয়ে যায় তার বাবার তৈরি অমূল্য শিল্পকর্ম। তবুও কালো কাপড় খুলে তিনি দেখান এক অসাধারণ বাক্স, যেখানে সোনালি আকাশে উড়ছে বিরল পাখি।

After an Earthquake, Preserving a Slow Craft in a Fast World - The New York  Times

নতুন প্রজন্মের টানাপোড়েন
ওয়াজিমার ল্যাকার শিল্পে কর্মীদের বড় অংশই ষাটের বেশি বয়সী। তরুণরা আগ্রহী হলেও আয়ের অনিশ্চয়তায় অনেকেই অন্য পেশা বেছে নেয়। তবুও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু রাখার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে তরুণদের জন্য আলাদা কেন্দ্র গড়ে দৈনন্দিন ব্যবহার যোগ্য পণ্য তৈরি ও বিদেশি বাজারে পৌঁছানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

আশা এখনো রয়ে গেছে
আধুনিক দুনিয়ার গতির সঙ্গে ল্যাকার শিল্পের ধৈর্য মেলে না। তবুও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আর বিদেশি আগ্রহ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াজিমার শিল্পীরা তাদের ক্ষয়, শূন্যতা আর প্রত্যাবর্তনের আশা ফুটিয়ে তুলছেন ল্যাকারেই। শোতা তেরানিশির এক কাজে নদীতে ফিরে আসার অপেক্ষায় মাছের ঝাঁক যেন বলছে, মানুষের মতো তারাও ফিরতে চায়, শুধু একটু কারণ দরকার।

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন উচ্চ রেজোলিউশন ছবিতে নোভার বিস্ফোরণ নিয়ে পুরোনো ধারণা নড়ল

ভূমিকম্পের পরও টিকে থাকার লড়াই ওয়াজিমার ল্যাকার শিল্প

০৪:০০:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

জাপানের নোটো উপদ্বীপের ছোট শহর ওয়াজিমা একসময় ল্যাকার শিল্পের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ঘরবাড়ি, কর্মশালা আর মানুষের জীবন মিলিয়ে পুরো শহরটাই যেন ছিল এক চলমান কারখানা। কিন্তু নববর্ষের দিনে ভয়াবহ ভূমিকম্প সেই শহরকে বদলে দিয়েছে চিরতরে। ঘর হারিয়েছেন কারিগররা, ধ্বংস হয়েছে শত শত স্টুডিও। তবুও হাতছাড়া হয়নি তাদের শিল্প, হার মানেনি ল্যাকার।

ধ্বংসস্তূপে হারানো ঘর আর স্মৃতি
ওয়াজিমার প্রখ্যাত ল্যাকার শিল্পী কাজুও ইয়ামাগিশির বর্তমান ঠিকানা কানাজাওয়ার একটি সাধারণ ফ্ল্যাট। কিন্তু তার আসল ঘর আজও বেঁচে আছে একটি ল্যাকার ট্রের ভেতরে। কালো পৃষ্ঠের ওপর সূক্ষ্ম লাল রেখা, সোনালি আর ঝিনুকের ঝিলিক তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় হারানো শহরের সমুদ্রতটে। সেখানে সন্ধ্যার আলো পড়ত জাপান সাগরের জলে। সেই শহরই ভূমিকম্পে ধুয়ে গেছে।

নতুন বছরের প্রথম দিনে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্পে আগুন, ভূমিধস আর ধসে পড়া ভবনে ওয়াজিমার প্রায় ষাট হাজার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ হারান দুই শতাধিক মানুষ। ভেঙে পড়ে সড়ক, স্কুল, বন্দর। কয়েক মাস পর প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। উপকূল ভেঙে গিয়ে শুকিয়ে যায় অনেক মাছ ধরার ঘাট।

ওয়াজিমা ল্যাকার কেন আলাদা
ওয়াজিমার ল্যাকার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিচিত তার টেকসই মানের জন্য। উরুশি গাছের রস আর স্থানীয় কাদামাটির সূক্ষ্ম গুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি এই ল্যাকার সরকারি স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী শিল্প। ভূমিকম্পের আগে শহরের প্রায় সাতশো কারিগর নিজের বাড়িতেই কাজ করতেন। পুরো শহরটাই যেন ছিল একে অপরের সঙ্গে যুক্ত স্টুডিও।

Artists Keep Ancient Japanese Craft Alive

অস্থায়ী স্টুডিওতে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ভূমিকম্পের পর জাপান সরকার অর্থ সহায়তায় তৈরি করেছে অস্থায়ী ল্যাকার স্টুডিও। ছোট এই ঘরগুলোতেই এখন কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন অনেক শিল্পী। হাজার হাজার অস্থায়ী ঘর তৈরি হলেও ওয়াজিমার শতাধিক ল্যাকার প্রতিষ্ঠানের খুব কমই ক্ষতির বাইরে ছিল। শহরের মেয়র জানিয়েছেন, আগের মতো কাজ করা এখন সম্ভব নয়, কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে উৎপাদন থামানোও যায় না।

শহরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় তেইশ হাজার। স্কুল আর খেলার মাঠ ধ্বংস হওয়ায় বহু পরিবার শহর ছেড়েছে। শিশুদের বড় অংশ আর ফেরেনি। কৃষি, মৎস্য আর পর্যটনের পাশাপাশি ল্যাকারই ছিল ওয়াজিমার পরিচয়। তাই ল্যাকার মানেই শহরের অস্তিত্ব।

ধীর শিল্পের দীর্ঘ সাধনা
ল্যাকার তৈরি সহজ কাজ নয়। একটি বাটি বা শিল্পকর্মে লাগে শতাধিক ধাপ। কাঠের গঠন থেকে শুরু করে একের পর এক স্তর বসাতে হয় ধৈর্য নিয়ে। চিংকিন, মাকি এ, রাদেনের মতো জটিল কৌশলে সোনা, রুপা আর ঝিনুক বসিয়ে তৈরি হয় নকশা। প্রতিটি স্তর শুকাতে লাগে আর্দ্রতা আর উষ্ণতা। এই গভীরতা আর আলোছায়ার খেলা কেবল ল্যাকারেই সম্ভব।

ক্ষয় আর স্মৃতির ভার
পঁচাশি বছর বয়সী শিল্পী ফুমিও মায়ে আজও চোখে ভাসান হারানো বাড়ির দৃশ্য। পরিবারের সঙ্গে নববর্ষের ভোজ চলাকালেই শুরু হয় কম্পন। আগুনে পুড়ে যায় ঘর, সঙ্গে হারিয়ে যায় তার বাবার তৈরি অমূল্য শিল্পকর্ম। তবুও কালো কাপড় খুলে তিনি দেখান এক অসাধারণ বাক্স, যেখানে সোনালি আকাশে উড়ছে বিরল পাখি।

After an Earthquake, Preserving a Slow Craft in a Fast World - The New York  Times

নতুন প্রজন্মের টানাপোড়েন
ওয়াজিমার ল্যাকার শিল্পে কর্মীদের বড় অংশই ষাটের বেশি বয়সী। তরুণরা আগ্রহী হলেও আয়ের অনিশ্চয়তায় অনেকেই অন্য পেশা বেছে নেয়। তবুও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু রাখার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে তরুণদের জন্য আলাদা কেন্দ্র গড়ে দৈনন্দিন ব্যবহার যোগ্য পণ্য তৈরি ও বিদেশি বাজারে পৌঁছানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

আশা এখনো রয়ে গেছে
আধুনিক দুনিয়ার গতির সঙ্গে ল্যাকার শিল্পের ধৈর্য মেলে না। তবুও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আর বিদেশি আগ্রহ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াজিমার শিল্পীরা তাদের ক্ষয়, শূন্যতা আর প্রত্যাবর্তনের আশা ফুটিয়ে তুলছেন ল্যাকারেই। শোতা তেরানিশির এক কাজে নদীতে ফিরে আসার অপেক্ষায় মাছের ঝাঁক যেন বলছে, মানুষের মতো তারাও ফিরতে চায়, শুধু একটু কারণ দরকার।