চীনের বিশাল ক্রয়ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আমদানিতে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো এবং আরও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য কাঠামোর দিকে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সাবেক উপদেষ্টা। তাঁর মতে, এতে বৈশ্বিক পর্যায়ে ইউয়ানের ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে।
ইউয়ানের আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিকিউরিটিজ টাইমস-এর প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, স্টেট কাউন্সিলের ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের সাবেক উপমন্ত্রী লিউ শিজিন বলেন, বিশ্বে পণ্য রপ্তানিতে চীন শীর্ষে থাকলেও ইউয়ানের আন্তর্জাতিক অবস্থান এখনও অনেক পিছিয়ে। তিনি মনে করেন, এই ব্যবধান কমানো এখন জরুরি।

পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় লক্ষ্য
শনিবার পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে লিউ শিজিন বলেন, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে এই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রে ইউয়ানে লেনদেনের হার বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন।
ডলার অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব
লিউ শিজিনের এই মন্তব্য নতুন গুরুত্ব পেয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ইউয়ানের মান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ডলার ব্যবহারের কৌশল এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
শক্তিশালী মুদ্রার শর্ত
লিউ বলেন, একটি শক্তিশালী মুদ্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আমদানির বড় অংশ নিজস্ব মুদ্রায় নিষ্পত্তি হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের জনসংখ্যা প্রায় চার গুণ বেশি হওয়ায়, দেশটির জন্য আরও বড় ভোক্তা বাজার গড়ে তোলা সম্ভব।
![]()
বিশাল বাজার ও আমদানির চিত্র
জ্বালানি ও কাঁচামালের বড় ক্রেতা হিসেবে চীন বিদেশি উৎপাদকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৪০ কোটির বেশি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীন ২ দশমিক ৫৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
ইউয়ানে বাণিজ্য নিষ্পত্তির অগ্রগতি
পিপলস ব্যাংক অব চায়নার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীনের সীমান্তপারের পণ্য বাণিজ্যে প্রায় ১৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ান নিষ্পত্তি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এটি মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে ধারণা করা হয়, এর বড় অংশই রপ্তানি নিষ্পত্তিতে কেন্দ্রীভূত।
কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত
এই নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রায়ত্ত চায়না মিনারেল রিসোর্সেস গ্রুপ দেশীয় বড় ক্রেতাদের অস্ট্রেলিয়ার খনি কোম্পানি বিহেপির নতুন ডলারভিত্তিক সামুদ্রিক পণ্য কেনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বলেছিল বলে জানা গেছে।

ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণে সরকারি উদ্যোগ
সীমান্তপারের ইউয়ান লেনদেন শুরু হওয়ার ১৭ বছর পরও চীন মুদ্রাটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে ডলারকে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা বাড়ায় এই প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। গত অক্টোবরে পিপলস ব্যাংক অব চায়না ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহৃত সতর্ক ও ধীরগতির ভাষা বাদ দেয়।
বিশ্ব পেমেন্টে ইউয়ানের অবস্থান
আন্তর্জাতিক আন্তব্যাংক লেনদেন সংস্থা সুইফটের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক পেমেন্টে ইউয়ানের অংশ ২০১১ সালের শেষে যেখানে ছিল শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২৫ সালের নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৯৪ শতাংশে। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এটি সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে একই সময়ে ডলারের অংশ ছিল প্রায় ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
বাণিজ্য ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
লিউ শিজিন আরও বলেন, আমদানির মাধ্যমে ইউয়ান বিদেশে যাওয়ার পাশাপাশি শক্তিশালী অফশোর বিনিয়োগ বাজার গড়ে তুলতে হবে, যাতে সেই ইউয়ান আবার দেশে ফিরে আসে এবং একটি কার্যকর চক্র তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য বলছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের বাণিজ্য ভারসাম্য আরও বেড়েছে এবং ২০২৫ সালে দেশটি রেকর্ড ১ দশমিক ১৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















