দেশের বিদ্যুৎ খাতে নীরবে কিন্তু গভীর এক সংকট তৈরি হচ্ছে। বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে জরিমানা কর্তন, চলমান সালিশ থাকা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ অমান্য, দেশি ও বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বৈষম্য এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া বিল—সব মিলিয়ে খাতটির স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই নয়, ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি আমদানি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিবেশেও পড়ছে।
সালিশ চলমান, তবু জরিমানা কর্তন
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ৩০টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে সালিশ আবেদন করে। অভিযোগ ছিল, অতিরিক্ত উৎপাদন বন্ধকাল দেখিয়ে পূর্বনির্ধারিত জরিমানা কেটে নেওয়া হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মূল কারণ ছিল দীর্ঘদিন ধরে বিল পরিশোধ না হওয়া।

গত ৮ জানুয়ারি বিইআরসি এসব আবেদন খারিজ করে উভয় পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে সালিশ চলাকালে জরিমানা গণনা ও কর্তনের বিষয়ে বিদ্যমান অবস্থা অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়। তবে এই নির্দেশের পরও বিপিডিবি কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল থেকে জরিমানা কেটে নেয়। এতে উৎপাদকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতা আরও বেড়েছে।
রমজান ও সেচ মৌসুমে বাড়তি ঝুঁকি
প্রতিবছর রমজান, গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়ে। বর্তমানে চাহিদা রয়েছে ১০ থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, আসন্ন গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। গত বছর সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট এবং উৎপাদন হয়েছিল ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই সময়ের ঠিক আগে উৎপাদকদের সঙ্গে বিপিডিবির বিরোধ বিদ্যুৎ সরবরাহকে অস্থির করে তুলতে পারে।

উৎপাদন সীমিত করার শঙ্কা
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা জানিয়েছেন, আর্থিক চাপ আরও বাড়লে অনেক কেন্দ্র বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমাতে পারে। এর প্রভাব পড়বে সেচ, শিল্প খাত এবং সাধারণ মানুষের ওপর।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত বলেন, সামনে রমজান ও গ্রীষ্মকাল বিদ্যুতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে বকেয়া বিল পরিশোধ না হলে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অনেক কেন্দ্রের ছয় মাসের বেশি সময়ের বিল পরিশোধ হয়নি, ফলে ব্যাংকঋণের সুদ দিতে গিয়ে উদ্যোক্তারা চরম চাপে পড়ছেন। এই অবস্থা চলতে থাকলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আস্থা ভেঙে পড়বে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে জাতীয় বিদ্যুৎ নিরাপত্তায়।
দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বৈষম্যের অভিযোগ
ডেভিড হাসানাত অভিযোগ করেন, জরিমানা কর্তনের ক্ষেত্রে বিপিডিবি দেশীয় ও বিদেশি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভিন্ন নীতি অনুসরণ করছে। বিদেশি মালিকানাধীন কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে চুক্তিতে জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করা হচ্ছে না, অথচ দেশীয় কেন্দ্রগুলো নিয়মিত জরিমানার মুখে পড়ছে।

তিনি জানান, বেসরকারি খাতে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট এবং বিনিয়োগ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বিনিয়োগ দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখলেও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিপিডিবির সতর্কবার্তা
বিপিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকরা বকেয়া না পেলে কেন্দ্র চালাতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রও সহজে বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে সামনে চাহিদা ও সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
একই চুক্তি, ভিন্ন বাস্তবতা
বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কম্পানি লিমিটেডের একটি ঘটনায় বৈষম্যের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ভাতা থেকে জরিমানা কাটা হলেও পরে ভিন্ন আইনি মতামত ও মন্ত্রণালয়ের সম্মতিতে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। একই ধরনের চুক্তির আওতায় এক প্রতিষ্ঠানে অর্থ ফেরত আর অন্যদের ক্ষেত্রে জরিমানা বহাল রাখার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি আইনের সমতার নীতির পরিপন্থী এবং ভবিষ্যতে বড় আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
দেশি-বিদেশি নীতির প্রশ্নে বিপিডিবির অবস্থান

বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, জরিমানা কর্তনের ক্ষেত্রে দেশি বা বিদেশি বলে কোনো ভিন্নতা নেই। নিয়ম অনুযায়ী এলডি কর্তন হলে তা সবার জন্যই প্রযোজ্য। বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে তিনি জানান, অর্থ পরিশোধে কাজ চলছে।
অর্থ পরিশোধ ব্যর্থতাই মূল সংকট
নথিপত্র অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদকরা একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছেন, সময়মতো বিল না পাওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না এবং ব্যাংক ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপিডিবির আর্থিক ব্যর্থতা থেকে সৃষ্ট উৎপাদন ব্যাঘাতের দায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর চাপানো হচ্ছে, যা চুক্তি ও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিশেষ আইনের চুক্তি পর্যালোচনার অগ্রগতি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন, ২০১০-এর অধীনে হওয়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। প্রতিবেদনটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রতিবেদনটি পর্যালোচনার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হবে এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















