বিশ্বে প্রথমবারের মতো একক শিল্প স্থাপনায় তিন ধরনের পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর একত্র করে অতি উচ্চতাপের বাষ্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে চীন। জিয়াংসু প্রদেশের লিয়ানইউনগাংয়ে নির্মাণাধীন একটি বিশ্বমানের পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি শক্তি সরবরাহ করা হবে। এই বাষ্পের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা অণু ভাঙার মতো শিল্পপ্রক্রিয়ায় ব্যবহারযোগ্য।
প্রকল্পের অবস্থান ও কাঠামো
লিয়ানইউনগাং চীনের সাতটি প্রধান পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পভিত্তির একটি। এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে এমন এক পারমাণবিক ব্যবস্থা, যেখানে দুটি তৃতীয় প্রজন্মের হুয়ালং ওয়ান চাপযুক্ত পানিভিত্তিক রিঅ্যাক্টর এবং একটি চতুর্থ প্রজন্মের উচ্চতাপ গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টর একসঙ্গে কাজ করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এই রিঅ্যাক্টরগুলো শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় অতি উচ্চতাপের বাষ্প সরবরাহ করবে।
এই ধরনের একীভূত ব্যবস্থায় আগে কখনো একাধিক প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও শিল্পমানের তাপ উৎপাদন করা হয়নি।

নির্মাণের অগ্রগতি ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
মূল ভূখণ্ডের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জুওয়েই পারমাণবিক হিটিং ও পাওয়ার প্রকল্পের প্রথম ধাপের ইউনিট একের পারমাণবিক দ্বীপ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রথম কংক্রিট ঢালাইয়ের মধ্য দিয়ে এই ধাপের সূচনা হয়েছে।
এর ফলে লিয়ানইউনগাংয়ের পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পভিত্তি ধীরে ধীরে অসংখ্য অদক্ষ ও বিচ্ছিন্ন কয়লাভিত্তিক বয়লার ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি শূন্য-কার্বন কেন্দ্রীয় তাপ উৎসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
এই প্রকল্পটি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রথম ধাপে দুটি বারো শূন্য আট মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্ষমতাসম্পন্ন হুয়ালং ওয়ান রিঅ্যাক্টর এবং একটি ছয় শূন্য শূন্য মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন উচ্চতাপ গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
হুয়ালং ওয়ান রিঅ্যাক্টরগুলো মূলত স্থিতিশীল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও প্রাথমিক তাপ সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হবে। অপরদিকে উচ্চতাপ গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টরটি সাত শ’ থেকে এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বাষ্প উৎপাদন করতে সক্ষম, যা রাসায়নিক শিল্পের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।

উৎপাদন সক্ষমতা ও পরিবেশগত প্রভাব
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি পঁচিশ লাখ টন শিল্প বাষ্প সরবরাহ করা হবে এবং সর্বোচ্চ এক হাজার একশ’ পঞ্চাশ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
এর ফলে বছরে প্রায় বাহাত্তর লাখ ছাব্বিশ হাজার টন মানক কয়লার ব্যবহার কমবে এবং প্রায় এক কোটি ছিয়ানব্বই লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস পাবে। এই পরিমাণ নিঃসরণ কমানো মানে প্রায় পঞ্চাশ লাখ পেট্রোলচালিত গাড়ি এক বছরের জন্য সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার সমান প্রভাব।
শিল্পভিত্তির চাহিদা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
লিয়ানইউনগাং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পভিত্তি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত সম্প্রসারণ দেখেছে। এখানে একাধিক বিশ্বপ্রথম স্থাপনা থাকলেও বার্ষিক চল্লিশ মিলিয়ন টন পরিশোধন ক্ষমতা এখনো বৈশ্বিক সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিচে।
বিশ্বের বৃহত্তম একক পরিশোধন কমপ্লেক্স হিসেবে ভারতের গুজরাটে অবস্থিত জামনগর শোধনাগার বছরে প্রায় বাষট্টি মিলিয়ন টন পরিশোধন সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে বাষ্পের গুরুত্ব
তেল পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে বাষ্প অপরিহার্য। অপরিশোধিত তেল পাতনে তাপীয় পৃথকীকরণ এবং অনুঘটক ভাঙনের মতো প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিপুল পরিমাণ বাষ্প প্রয়োজন হয়।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লিয়ানইউনগাং শিল্পভিত্তিতে বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ তেরো হাজার টন বাষ্প ব্যবহার হয়, যা আগে মূলত কয়লাসহ জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদিত হতো।
কার্বন লক্ষ্য ও নীতিগত সিদ্ধান্ত
চীন দুই হাজার ত্রিশ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণে পৌঁছানো এবং দুই হাজার ষাট সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে লিয়ানইউনগাংয়ের শিল্প সম্প্রসারণে পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছিল। এর ফলেই জিয়াংসু প্রাদেশিক সরকার চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্পে এগিয়ে আসে।
কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
এই প্রকল্পে হুয়ালং ওয়ান রিঅ্যাক্টর প্রথমে লবণমুক্ত পানি গরম করে সম্পৃক্ত বাষ্প তৈরি করবে। এরপর উচ্চতাপ গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টর সেই বাষ্পকে আরও উত্তপ্ত করে উচ্চমানের শিল্প বাষ্পে রূপান্তর করবে।
তবে বাস্তবায়ন সহজ নয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক নেতা জানিয়েছেন, এখানে তিনটি বিষয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয় প্রয়োজন—রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যবহারকারীর বাষ্পের চাহিদা পূরণ করা এবং বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতার সীমা মেনে চলা।

দেশীয় শিল্প উন্নয়নের লক্ষ্য
চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশনের মতে, এই উদ্যোগ কেবল একটি জ্বালানি স্থাপনা নির্মাণ নয়, বরং স্বনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পশৃঙ্খল গড়ে তোলার প্রচেষ্টা।
প্রকল্পের জন্য সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তির ষাট শতাংশের বেশি পেয়েছে দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে বহু বিশেষায়িত উদ্ভাবনী কোম্পানি উচ্চমানের পারমাণবিক প্রযুক্তির বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















