ইরানের রাজপথ আবারও অস্থিরতায় কাঁপছে। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ জানুয়ারিজুড়ে একাধিক প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের কড়া দমননীতি পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে জনঅসন্তোষ আরও গভীর করেছে। তবে এবারের সংকটের তাৎপর্য শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ইরানের বাইরের অংশীদারদের ওপরও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে চীনের ক্ষেত্রে এই অস্থিরতা বহুদিনের ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
চীনের দীর্ঘদিনের ধারণা কেন টলমল
বছরের পর বছর ধরে বেইজিং ইরানকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে দেখেছে, যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত হলেও ইরানকে রাজনৈতিকভাবে টেকসই ও কৌশলগতভাবে কার্যকর অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। চীনের নীতির ভিত্তি ছিল এই বিশ্বাস যে, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সত্ত্বেও ইরান পূর্বানুমেয় থাকবে। ঘরোয়া বিক্ষোভকে গুরুত্বহীন শব্দ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল, যা জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো প্রকল্প বা কূটনৈতিক সমন্বয়ে বড় প্রভাব ফেলবে না। বর্তমান বাস্তবতায় এই ধারণা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার বাস্তবতা
নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান অর্থনৈতিকভাবে চীনের ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা স্বাভাবিক অংশীদারত্বের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। চীন এখন কেবল বড় বাণিজ্যিক অংশীদার নয়; কার্যত ইরানের প্রধান অর্থনৈতিক জীবনরেখা। এই অসাম্য সবচেয়ে স্পষ্ট জ্বালানি খাতে। ইরানের অধিকাংশ তেল রপ্তানি চীনই গ্রহণ করে, তাও বড় ছাড়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে, যা নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় প্রভাবিত। সহযোগিতা বলা হলেও এই সম্পর্ক ক্রমেই একতরফা সুবিধার চেহারা নিয়েছে, যেখানে লাভের বড় অংশ যাচ্ছে চীনের ঘরে।
সস্তা জ্বালানি ও লুকানো ঝুঁকি
এই ব্যবস্থায় চীন বহু ব্যয় এড়িয়ে গেছে। কম দামে জ্বালানি, বিশেষ সুবিধা এবং সীমিত প্রতিযোগিতা বেইজিংকে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা এনে দিয়েছে। কিন্তু চলমান অস্থিরতা এই মডেলের দুর্বলতা সামনে আনছে। জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু সরবরাহের বিষয় নয়; রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অস্থিরতা যখন সাময়িক না হয়ে স্থায়ী রূপ নেয়, তখন সস্তা তেলও কৌশলগত ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।

সমাজজুড়ে ক্লান্তি ও চীনের দ্বিধা
ইরানজুড়ে চলমান বিক্ষোভে সমাজের নানা স্তর, অঞ্চল ও প্রজন্মের গভীর ক্লান্তি ফুটে উঠছে। ব্যাপক গ্রেপ্তার ও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ দেখাচ্ছে, নেতৃত্ব পরিবর্তনের বদলে টিকে থাকাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। চীনের জন্য এটি বড় দোটানা। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার যে নীতি বেইজিং দীর্ঘদিন অনুসরণ করে এসেছে, এই পরিস্থিতিতে তা সহজ সমাধান দিচ্ছে না।
স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়ানো মধ্যপ্রাচ্য নীতি
চীনের মধ্যপ্রাচ্য কৌশল মূলত স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে। আদর্শিক অবস্থান এড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কৌশলই ছিল তার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ইরানের মতো ক্ষেত্রে এই নীতি চ্যালেঞ্জের মুখে। অস্থিরতা যদি কাঠামোগত হয়ে ওঠে, নিরপেক্ষতা তখন আর ঢাল হিসেবে কাজ করে না। অবকাঠামো বিনিয়োগ, পরিবহন করিডর ও জ্বালানি চুক্তি—সবকিছুই একটি ন্যূনতম অভ্যন্তরীণ সংহতির ওপর নির্ভর করে। সেই সংহতি ক্ষয় হলে বাণিজ্যিক বাস্তববাদও বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
আন্তর্জাতিক চাপ ও শুল্কের হুমকি
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। ইরানের শহরগুলোতে দমননীতি ও মৃত্যুর খবরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে অতিরিক্ত শুল্ক, এমনকি পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের মুখে পড়তে হবে। সতর্কবার্তাটি সবার জন্য বলা হলেও লক্ষ্য যে চীন—তা স্পষ্ট। প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, ইরানের অবশিষ্ট বড় অংশীদারদের মধ্যে চীনই প্রকাশ্যে ক্ষুব্ধ হয়, কারণ সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে তার কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ।
কৌশলগত বিকল্প সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা
এই ঘটনাই একটি গভীর দুর্বলতা সামনে আনে। কঠোর নিষেধাজ্ঞায় থাকা এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থির একটি দেশের ওপর জ্বালানি আমদানি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত করে চীন নিজেই নিজের বিকল্প সংকুচিত করেছে। যা একসময় ধৈর্য ও দূরদর্শিতা মনে হয়েছিল, তা এখন জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রতীকী গুরুত্ব বনাম বাস্তব স্থিতিশীলতা
অর্থনীতির বাইরে ইরান চীনের বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণায় প্রতীকী ভূমিকা রাখে। পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ব্যবস্থার বাইরে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের উদাহরণ হিসেবে ইরানকে দেখা হয়। কিন্তু প্রতীক কখনো স্থিতিশীলতার বিকল্প হতে পারে না। অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত কোনো অংশীদার আঞ্চলিক সমন্বয়ে দুর্বল হয় এবং আচরণে অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে এটি চীনের অবস্থান শক্ত করার বদলে দুর্বল করে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা
বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও সামাজিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। টানা বিক্ষোভ, শ্রম অচলাবস্থা ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবেশে এসব প্রকল্প টেকসই হতে পারে না। ইরানের পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে গৌণ ধরে নেওয়া বিনিয়োগ মডেলের সীমা কোথায়।

ভবিষ্যৎ রাজনীতির সম্ভাব্য মোড়
দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের অস্থিরতা বা শাসনব্যবস্থার রূপান্তর হলে তেহরানের পররাষ্ট্রনীতিও নতুন পথে যেতে পারে। এমনকি সরকার বদল না হলেও সংকট-পরবর্তী ইরান পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করতে পারে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও নতুন চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির জন্য জ্বালানি খাত খুলে দিতে পারে।
চীনের হিসাব বদলে যাওয়ার আশঙ্কা
এ ধরনের পরিবর্তন চীনের কৌশলগত হিসাব আমূল বদলে দেবে। সস্তা ইরানি জ্বালানিতে বিশেষ প্রবেশাধিকার আর নিশ্চিত থাকবে না। একচেটিয়ার জায়গায় আসবে প্রতিযোগিতা। এতে ব্যয় বাড়বে, প্রভাব কমবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভারসাম্য বদলে গিয়ে পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে ইরানের ভূমিকা কমে যেতে পারে, যা চীনকে মধ্যপ্রাচ্য নীতি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
ইরানি রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক পতনের ইঙ্গিত নেই। নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী এবং নেতৃত্ব আগেও সংকট টিকে গেছে। তবে টিকে থাকা আর স্থিতিশীলতা এক নয়। ধীরে ধীরে বৈধতার ক্ষয় ঘটছে, যা বাইরের অংশীদারদের জন্য গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের অস্থিরতা এখনই চীনকে নাটকীয় সিদ্ধান্তে ঠেলে দিচ্ছে না, তবে অনিশ্চয়তার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত করছে। তেহরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কৌশলের ভবিষ্যতের সঙ্গে। ইরানের ভেতরে যেকোনো অর্থবহ পরিবর্তন চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে প্রতিধ্বনি তুলবে। এই অর্থে বিক্ষোভ শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ নয়; এটি একটি অস্থির অঞ্চলে ঝুঁকি, নির্ভরতা ও ক্ষমতা ব্যবস্থাপনায় চীনের জন্য নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















