০১:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
ন্যাটোর ভাঙন বাড়তে দেখে উল্লসিত রাশিয়া ২০২৬ সালে পাকিস্তানের সামনে কঠিন সিদ্ধান্তের সময় হাসিনা আপার কর্মী-সমর্থকদের পাশে থাকব : মির্জা ফখরুল ভয়াবহ শীতঝড়ে বিপর্যয়ের আশঙ্কা, তুষার ও বরফে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে কোটি মানুষ ময়মনসিংহে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, পুড়ে গেছে নথি ও আসবাব দিল্লিতে প্রথমবার প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য একটি দল ভারতের সঙ্গে আপস করে বাংলাদেশকে বিক্রি করতে চায়: তাহের কুমারখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ইসলামী আন্দোলনের নেতা নিহত যশোর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির নির্বাচনী প্রচারণায় হামলার অভিযোগ মুন্সিগঞ্জ–৩ আসনে নির্বাচনী মিছিলে সংঘর্ষ, আহত অন্তত ছয়জন

“হ্যাঁ” “না” ভোট ও খাল কাটার সেইসব দিনগুলি

১৯৭৭ সালের ৩০ মে বরিশালের প্রত্যন্ত একটা গ্রামের স্কুলের মাঠে বসে আছি। ধীরে ধীরে দুপুর গড়িয়ে আসছে। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবলই মনে হয় কবি ও অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের কবিতার দুটি লাইন,

“অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়
একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ”
পৃথিবীর সব দেশই সুন্দর। মরুভূমিরও একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে যা কোনো সবুজ পাতা দিতে পারে না। তার পরেও নিজ জন্মভূমি সবার কাছে ভালো লাগায় ভিন্নমাত্রা পায়। পূর্ববাংলা বা আজকের বাংলাদেশ যে কোনো বাংলাদেশি বাঙালির কাছে তাই একটু আলাদা ভালোবাসারই হবে। তবে তারপরেও পূর্ববাংলা বলতে যা বোঝায় সেই সবুজ স্নিগ্ধ মেয়েটি অনেক বেশি ছিল এক সময়ের বরিশাল।
এত সবুজ, এত জল, এত নির্মল আকাশ – যা কেবল মুগ্ধতাই ছড়াত।
তাছাড়া হতে পারে, বড় নির্ভার হয়ে তখন বরিশালের পথে প্রান্তরে ঘুরছিলাম বলেই আরও বেশি মুগ্ধতা জড়িয়ে ধরেছিল।

যাহোক, দুপুরের সূর্য হেলে পড়া থেকে ওই মাঠের পাশ ঘিরে বড় বড় অনেকগুলো গাছের ছায়ায় বসেছিলাম। কোনো লোকজন ওই মাঠে দেখিনি।
বিকেল চারটার পরে হঠাৎ দেখি স্কুলের ঘরগুলোর ভেতর থেকে কয়েকজন পুলিশের সঙ্গে কয়েক ব্যক্তি বের হয়ে আবার ভেতরে গেলেন।
আমি কোনো অপরাধী নই। বরং আমার সে যাত্রা ছিল মূলত প্রতিষ্ঠানের গণ্ডির ভালো ছাত্র থেকে খারাপ ছাত্র হওয়ার যাত্রা। তাই সব কিছুতেই নির্ভার। একটা হালকা মনে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাই।
স্কুলের বারান্দায় পা দিতেই বুঝতে পারি কোনো একটা ভোট হচ্ছে বা হয়ে গেছে। পুলিশের সঙ্গে সাদা পোশাকের ব্যক্তি ক’জন মূলত স্কুল শিক্ষক। তাঁরা ওই ভোটের প্রিজাইডিং অফিসার।
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি অধিকাংশ শিক্ষকের একটি সুন্দর গুণ ছিল আগে, তাঁরা নির্দ্বিধায় যে কাউকে ছাত্র মনে করতে পারতেন, কাজে হুকুম করতেন। আমাকে দেখে একজন শিক্ষক, বরিশালের আঞ্চলিক টানে যা বললেন, তার অর্থ দাঁড়ায়, আমি অঙ্ক জানি কিনা? সেজদাদা যিনি আমাকে অঙ্ক শিখিয়েছিলেন, তাঁর সম্মানের কথা চিন্তা করে আর না বলতে পারিনি। তখন ওই শিক্ষক আমাকে স্কুলের রুমের ভেতর ডাকেন। রুমে গিয়ে দেখি নির্বাচনের জন্য বুথ সাজানো। আর বাইরে তাঁরা এক জায়গায় গাদি করে রেখেছেন কিছু ব্যালট বক্স। তখন ব্যালট বক্স কালো রঙের ছিল। কারণ তখনও শেখ হাসিনা আন্দোলন করে এই চিরাচরিত ব্যালট বক্স বদল করে স্বচ্ছ ব্যালট বক্সের প্রচলনে নির্বাচন কমিশনকে রাজি করাননি।
দেখতে পাই কাছে যে ব্যালট বক্সগুলো গাদি করা তার গায়ে “হ্যাঁ” লেখা। আর দূরে যেগুলো সেগুলোর গায়ে “না” লেখা।
ওই শিক্ষক মহোদয় আমাকে যে কাজের জন্য ডাকলেন তা মোটামুটি এমন, বক্সে হ্যাঁ সিল মারা যে সংখ্যক ব্যালট ঢোকানো হয়েছে তার মোট সংখ্যা থেকে কত ব্যালট বাদ দিলে মোট ভোটার উপস্থিতি ৮০ শতাংশের কিছু বেশি হবে। এবং কাস্টিং ভোটের পারসেন্টেজ ৯০ শতাংশের ওপরে হবে। এটুকু আঁক কষার জন্য আর যাই হোক, যাদব বাবুর পাটিগণিত করা লাগে না। দ্রুতই কাজটা করে দিলে শিক্ষক মহোদয় খুবই খুশি হলেন। এবং এও জানালেন, তিনি বাংলার শিক্ষক। ব্যাকরণ খুব ভালো জানেন। তাঁর বাবা কি যেন চক্রবর্তী (নামটা ভুলে গেছি) মহাশয় সংস্কৃত ব্যাকরণের শিক্ষক ছিলেন।


কথা না বাড়িয়ে নমস্কার দিয়ে বেরিয়ে পড়ি বন্ধুর বাড়ির পথে। পথে আশা আইসক্রিম ফ্যাক্টরির পাশে বাঁশের শলাকায় আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে। একটা আইসক্রিম নিয়ে চুষতে চুষতে চলতে থাকি।
বুঝতে পারি, আজ রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের “হ্যাঁ” “না” ভোট হয়ে গেল। আর এই ভোটের বিজয়ের ভেতর দিয়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা পেলেন।
তখন বরিশাল এলাকার ও তার কাঁচা রাস্তাগুলোর দুই ধারে শুধু যে টলটলে জলভরা খাল ছিল তা নয়, অনেক গাছের পাতা ও ফুলের মিলিত একটা আলাদা গন্ধ ছিল। নাক ওই গন্ধ টেনে নেয়, “হ্যাঁ” “না” ভোট মস্তিষ্কের কোষ থেকে চলে যায়।
ওই বছর জুন মাস থেকে অনেক বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। রমজান মাসও মনে হয় পড়েছিল আগস্ট কি সেপ্টেম্বরে। তখন বাংলাদেশের সবগুলো ছোট বড় শহরও গ্রামের মতো ঘন সবুজ ছিল। তাই গাছের পাতায় শীত নেমে আসত হেমন্তের শুরুতেই।
এই হেমন্তের হালকা কুয়াশা আর একটা মিষ্টি শীতের গন্ধভরা সকালে সে সময়ের খুলনা জেলার (বৃহত্তর খুলনা জেলা) একটি মহাকুমা শহরে খাল কাটতে আসবেন নায়িকা ববিতাসহ আরও অনেক সিনেমা ও বেতার শিল্পী। সে সময়ে বেতার শিল্পীরা যে সিনেমা স্টারদের সমান মাপের ছিলেন তা আজ অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। নায়িকা ববিতা ছোট বেলা থেকেই অনেক বড় অভিনেত্রী হলেও তাকে রূপালি পর্দার মানুষ থেকে নিজেদের চারপাশের মানুষ মনে হতো বেশি।
ভাবলাম, তিনিও খাল কাটবেন, দেখে আসি। বেলা ৯টায় খাল কাটার কথা ছিল তবে হেলিকপ্টার বা কী যেন আসা সহ সবার মেকআপ নিয়ে আসতে আসতেই প্রায় এগারটা বেজে গেল।
কিন্তু সমস্যা দেখা গেল, কাটার মতো খাল পাওয়া যাচ্ছে না। জোয়ার-ভাটার এলাকা। প্রায় সব খালই পানিতে পরিপূর্ণ। তাই একটি প্রখ্যাত কলেজের কাছে পাকা রাস্তার ধার দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘন চুলের বেনির মতো সুন্দরী একটি জলভরা খালের কিনার থেকে মাটি কেটে রাস্তার ঢালে মাটি ফেলার সিদ্ধান্ত হলো।
বিষয়টা কেমন যেন একটা সিনেমার শুটিংয়ের দৃশ্য মনে হচ্ছিল। তাই বার বার সেখানে পরিচালক আলমগীর কবির ভাইয়ের অনুপস্থিতি মনে হচ্ছিল।

এর ভেতর রাস্তার অপর পাশে একটু দূরে চোখ পড়তেই দেখি কলেজের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক দাঁড়িয়ে। তখনও ভালো কলেজগুলো প্রায় সবই বেসরকারি, তাই শিক্ষকবৃন্দও সিনিয়র। তাদের ভেতর কেমন একটা সেই ব্রিটিশ আমলের প্রেসিডেন্সি ও ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েটের ভিন্ন চলন।


সাইকেল থেকে নেমে সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে হেঁটে শিক্ষকদের কাছাকাছি যাই। সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি সেখানে। তখনও বাংলাদেশের মহাকুমা শহরগুলোতে নিয়মিত টাইম, নিউজ উইক, ফার ইস্টার্ন ইকোনমি রিভিউ, ভারতের দি উইকসহ নানান ম্যাগাজিন ও তার সঙ্গে বিভিন্ন সাবজেক্টের জার্নাল আসত। আর সেগুলোর একটা বড় পাঠক থাকতেন শিক্ষকরা। তখনও ছাত্রদের ব্যাচ পড়ানোর রীতি আসেনি। এনজিও কনসালটেন্সি আসেনি। শিক্ষকদের তাই বিকেল হলেই দেখা যেত শহরের বুক শপ ও ম্যাগাজিন বা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স কর্নারে।
এ কারণে তখন শিক্ষকদের যে কোনো জায়গায় যে কোনো আলোচনাই ছিল ছাত্রদের জন্য একটা ক্লাস। এখানেও দূরে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলাম, ওই শিক্ষকদের একজন বলছেন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ভারত যতই যোগাযোগ রাখুক না কেন, জিয়াউর রহমান জানেন গঙ্গা পানি চুক্তি তিনি করতে পারবেন না। ভারত তাঁর সঙ্গে গঙ্গা পানি চুক্তি করবে না। ভারত টাফ কান্ট্রি। জিয়াউর রহমানও বুদ্ধিমান মানুষ, তাই তিনি জনগণের জন্য খাল কাটা কর্মসূচি নিয়ে এসেছেন।
আরেকজন শিক্ষক তারপরেই বলেন, পাকিস্তানের দুই অংশ অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশসহ সব থেকে মুশকিলে আছে ভারতের বাই নেচার এই পানি শক্তির কাছে। কারণ একটি অংশ সিন্ধু অববাহিকার নিচের দিকে আর আমরা তো গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচের দিকে। তাই পানি শক্তি তাদের হাতে।
শিক্ষকদের কথা অন্যদিকে চলে যায়। তারপরে সময়ও অনেক গড়িয়ে যায়।

ততদিনে খাল কাটা কর্মসূচি থেকে কমিউনিস্টরাও সরে গেছে। মণি সিংয়ের জিয়াউর রহমানকে সমর্থন করে খাল কাটা তত্ত্ব ততদিনে শেষ। ওই সময়ে ময়মনসিংহ শহরের রাজনীতিকদের কাছে একটা গল্প শোনা যেত। গল্পটি ছিল এমনই, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদ তখনও ময়মনসিংহ জেলে। এ সময়ে একদিন গ্রেপ্তার হওয়া মণি সিংকে নিয়ে আসা হয়েছে ময়মনসিংহ জেলে। তাকে জেলে দেখে তোফায়েল আহমদ তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, মণি দা এখানে কেন? খাল কাটা কি শেষ?
পরবর্তীকালে তোফায়েল আহমদের কাছে এর সত্যতা জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসেছিলেন।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক সারাক্ষণ, The Present World.

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ন্যাটোর ভাঙন বাড়তে দেখে উল্লসিত রাশিয়া

“হ্যাঁ” “না” ভোট ও খাল কাটার সেইসব দিনগুলি

১১:১৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

১৯৭৭ সালের ৩০ মে বরিশালের প্রত্যন্ত একটা গ্রামের স্কুলের মাঠে বসে আছি। ধীরে ধীরে দুপুর গড়িয়ে আসছে। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবলই মনে হয় কবি ও অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের কবিতার দুটি লাইন,

“অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়
একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ”
পৃথিবীর সব দেশই সুন্দর। মরুভূমিরও একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে যা কোনো সবুজ পাতা দিতে পারে না। তার পরেও নিজ জন্মভূমি সবার কাছে ভালো লাগায় ভিন্নমাত্রা পায়। পূর্ববাংলা বা আজকের বাংলাদেশ যে কোনো বাংলাদেশি বাঙালির কাছে তাই একটু আলাদা ভালোবাসারই হবে। তবে তারপরেও পূর্ববাংলা বলতে যা বোঝায় সেই সবুজ স্নিগ্ধ মেয়েটি অনেক বেশি ছিল এক সময়ের বরিশাল।
এত সবুজ, এত জল, এত নির্মল আকাশ – যা কেবল মুগ্ধতাই ছড়াত।
তাছাড়া হতে পারে, বড় নির্ভার হয়ে তখন বরিশালের পথে প্রান্তরে ঘুরছিলাম বলেই আরও বেশি মুগ্ধতা জড়িয়ে ধরেছিল।

যাহোক, দুপুরের সূর্য হেলে পড়া থেকে ওই মাঠের পাশ ঘিরে বড় বড় অনেকগুলো গাছের ছায়ায় বসেছিলাম। কোনো লোকজন ওই মাঠে দেখিনি।
বিকেল চারটার পরে হঠাৎ দেখি স্কুলের ঘরগুলোর ভেতর থেকে কয়েকজন পুলিশের সঙ্গে কয়েক ব্যক্তি বের হয়ে আবার ভেতরে গেলেন।
আমি কোনো অপরাধী নই। বরং আমার সে যাত্রা ছিল মূলত প্রতিষ্ঠানের গণ্ডির ভালো ছাত্র থেকে খারাপ ছাত্র হওয়ার যাত্রা। তাই সব কিছুতেই নির্ভার। একটা হালকা মনে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাই।
স্কুলের বারান্দায় পা দিতেই বুঝতে পারি কোনো একটা ভোট হচ্ছে বা হয়ে গেছে। পুলিশের সঙ্গে সাদা পোশাকের ব্যক্তি ক’জন মূলত স্কুল শিক্ষক। তাঁরা ওই ভোটের প্রিজাইডিং অফিসার।
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি অধিকাংশ শিক্ষকের একটি সুন্দর গুণ ছিল আগে, তাঁরা নির্দ্বিধায় যে কাউকে ছাত্র মনে করতে পারতেন, কাজে হুকুম করতেন। আমাকে দেখে একজন শিক্ষক, বরিশালের আঞ্চলিক টানে যা বললেন, তার অর্থ দাঁড়ায়, আমি অঙ্ক জানি কিনা? সেজদাদা যিনি আমাকে অঙ্ক শিখিয়েছিলেন, তাঁর সম্মানের কথা চিন্তা করে আর না বলতে পারিনি। তখন ওই শিক্ষক আমাকে স্কুলের রুমের ভেতর ডাকেন। রুমে গিয়ে দেখি নির্বাচনের জন্য বুথ সাজানো। আর বাইরে তাঁরা এক জায়গায় গাদি করে রেখেছেন কিছু ব্যালট বক্স। তখন ব্যালট বক্স কালো রঙের ছিল। কারণ তখনও শেখ হাসিনা আন্দোলন করে এই চিরাচরিত ব্যালট বক্স বদল করে স্বচ্ছ ব্যালট বক্সের প্রচলনে নির্বাচন কমিশনকে রাজি করাননি।
দেখতে পাই কাছে যে ব্যালট বক্সগুলো গাদি করা তার গায়ে “হ্যাঁ” লেখা। আর দূরে যেগুলো সেগুলোর গায়ে “না” লেখা।
ওই শিক্ষক মহোদয় আমাকে যে কাজের জন্য ডাকলেন তা মোটামুটি এমন, বক্সে হ্যাঁ সিল মারা যে সংখ্যক ব্যালট ঢোকানো হয়েছে তার মোট সংখ্যা থেকে কত ব্যালট বাদ দিলে মোট ভোটার উপস্থিতি ৮০ শতাংশের কিছু বেশি হবে। এবং কাস্টিং ভোটের পারসেন্টেজ ৯০ শতাংশের ওপরে হবে। এটুকু আঁক কষার জন্য আর যাই হোক, যাদব বাবুর পাটিগণিত করা লাগে না। দ্রুতই কাজটা করে দিলে শিক্ষক মহোদয় খুবই খুশি হলেন। এবং এও জানালেন, তিনি বাংলার শিক্ষক। ব্যাকরণ খুব ভালো জানেন। তাঁর বাবা কি যেন চক্রবর্তী (নামটা ভুলে গেছি) মহাশয় সংস্কৃত ব্যাকরণের শিক্ষক ছিলেন।


কথা না বাড়িয়ে নমস্কার দিয়ে বেরিয়ে পড়ি বন্ধুর বাড়ির পথে। পথে আশা আইসক্রিম ফ্যাক্টরির পাশে বাঁশের শলাকায় আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে। একটা আইসক্রিম নিয়ে চুষতে চুষতে চলতে থাকি।
বুঝতে পারি, আজ রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের “হ্যাঁ” “না” ভোট হয়ে গেল। আর এই ভোটের বিজয়ের ভেতর দিয়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা পেলেন।
তখন বরিশাল এলাকার ও তার কাঁচা রাস্তাগুলোর দুই ধারে শুধু যে টলটলে জলভরা খাল ছিল তা নয়, অনেক গাছের পাতা ও ফুলের মিলিত একটা আলাদা গন্ধ ছিল। নাক ওই গন্ধ টেনে নেয়, “হ্যাঁ” “না” ভোট মস্তিষ্কের কোষ থেকে চলে যায়।
ওই বছর জুন মাস থেকে অনেক বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। রমজান মাসও মনে হয় পড়েছিল আগস্ট কি সেপ্টেম্বরে। তখন বাংলাদেশের সবগুলো ছোট বড় শহরও গ্রামের মতো ঘন সবুজ ছিল। তাই গাছের পাতায় শীত নেমে আসত হেমন্তের শুরুতেই।
এই হেমন্তের হালকা কুয়াশা আর একটা মিষ্টি শীতের গন্ধভরা সকালে সে সময়ের খুলনা জেলার (বৃহত্তর খুলনা জেলা) একটি মহাকুমা শহরে খাল কাটতে আসবেন নায়িকা ববিতাসহ আরও অনেক সিনেমা ও বেতার শিল্পী। সে সময়ে বেতার শিল্পীরা যে সিনেমা স্টারদের সমান মাপের ছিলেন তা আজ অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। নায়িকা ববিতা ছোট বেলা থেকেই অনেক বড় অভিনেত্রী হলেও তাকে রূপালি পর্দার মানুষ থেকে নিজেদের চারপাশের মানুষ মনে হতো বেশি।
ভাবলাম, তিনিও খাল কাটবেন, দেখে আসি। বেলা ৯টায় খাল কাটার কথা ছিল তবে হেলিকপ্টার বা কী যেন আসা সহ সবার মেকআপ নিয়ে আসতে আসতেই প্রায় এগারটা বেজে গেল।
কিন্তু সমস্যা দেখা গেল, কাটার মতো খাল পাওয়া যাচ্ছে না। জোয়ার-ভাটার এলাকা। প্রায় সব খালই পানিতে পরিপূর্ণ। তাই একটি প্রখ্যাত কলেজের কাছে পাকা রাস্তার ধার দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘন চুলের বেনির মতো সুন্দরী একটি জলভরা খালের কিনার থেকে মাটি কেটে রাস্তার ঢালে মাটি ফেলার সিদ্ধান্ত হলো।
বিষয়টা কেমন যেন একটা সিনেমার শুটিংয়ের দৃশ্য মনে হচ্ছিল। তাই বার বার সেখানে পরিচালক আলমগীর কবির ভাইয়ের অনুপস্থিতি মনে হচ্ছিল।

এর ভেতর রাস্তার অপর পাশে একটু দূরে চোখ পড়তেই দেখি কলেজের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক দাঁড়িয়ে। তখনও ভালো কলেজগুলো প্রায় সবই বেসরকারি, তাই শিক্ষকবৃন্দও সিনিয়র। তাদের ভেতর কেমন একটা সেই ব্রিটিশ আমলের প্রেসিডেন্সি ও ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েটের ভিন্ন চলন।


সাইকেল থেকে নেমে সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে হেঁটে শিক্ষকদের কাছাকাছি যাই। সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি সেখানে। তখনও বাংলাদেশের মহাকুমা শহরগুলোতে নিয়মিত টাইম, নিউজ উইক, ফার ইস্টার্ন ইকোনমি রিভিউ, ভারতের দি উইকসহ নানান ম্যাগাজিন ও তার সঙ্গে বিভিন্ন সাবজেক্টের জার্নাল আসত। আর সেগুলোর একটা বড় পাঠক থাকতেন শিক্ষকরা। তখনও ছাত্রদের ব্যাচ পড়ানোর রীতি আসেনি। এনজিও কনসালটেন্সি আসেনি। শিক্ষকদের তাই বিকেল হলেই দেখা যেত শহরের বুক শপ ও ম্যাগাজিন বা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স কর্নারে।
এ কারণে তখন শিক্ষকদের যে কোনো জায়গায় যে কোনো আলোচনাই ছিল ছাত্রদের জন্য একটা ক্লাস। এখানেও দূরে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলাম, ওই শিক্ষকদের একজন বলছেন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ভারত যতই যোগাযোগ রাখুক না কেন, জিয়াউর রহমান জানেন গঙ্গা পানি চুক্তি তিনি করতে পারবেন না। ভারত তাঁর সঙ্গে গঙ্গা পানি চুক্তি করবে না। ভারত টাফ কান্ট্রি। জিয়াউর রহমানও বুদ্ধিমান মানুষ, তাই তিনি জনগণের জন্য খাল কাটা কর্মসূচি নিয়ে এসেছেন।
আরেকজন শিক্ষক তারপরেই বলেন, পাকিস্তানের দুই অংশ অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশসহ সব থেকে মুশকিলে আছে ভারতের বাই নেচার এই পানি শক্তির কাছে। কারণ একটি অংশ সিন্ধু অববাহিকার নিচের দিকে আর আমরা তো গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচের দিকে। তাই পানি শক্তি তাদের হাতে।
শিক্ষকদের কথা অন্যদিকে চলে যায়। তারপরে সময়ও অনেক গড়িয়ে যায়।

ততদিনে খাল কাটা কর্মসূচি থেকে কমিউনিস্টরাও সরে গেছে। মণি সিংয়ের জিয়াউর রহমানকে সমর্থন করে খাল কাটা তত্ত্ব ততদিনে শেষ। ওই সময়ে ময়মনসিংহ শহরের রাজনীতিকদের কাছে একটা গল্প শোনা যেত। গল্পটি ছিল এমনই, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদ তখনও ময়মনসিংহ জেলে। এ সময়ে একদিন গ্রেপ্তার হওয়া মণি সিংকে নিয়ে আসা হয়েছে ময়মনসিংহ জেলে। তাকে জেলে দেখে তোফায়েল আহমদ তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, মণি দা এখানে কেন? খাল কাটা কি শেষ?
পরবর্তীকালে তোফায়েল আহমদের কাছে এর সত্যতা জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসেছিলেন।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক সারাক্ষণ, The Present World.