ইউক্রেনে আটক বিদেশি যুদ্ধবন্দিদের জীবন আজ এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের আশায় দিন গুনছেন বহু মানুষ, কিন্তু সেই বিনিময় আদৌ হবে কি না, তা কেউ জানে না।
ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলের একটি কারাগারে নীরবতা ভেঙে হঠাৎ একটি চিৎকার ভেসে আসে। করিডোর জুড়ে প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে, সিঁড়িতে জড়ো হতে থাকেন নানা দেশের মানুষ। মিসর, চীন, ক্যামেরুন, কেনিয়া থেকে শুরু করে ইতালির নাগরিক ও আছেন সেখানে। সবাই রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে ইউক্রেনের হাতে ধরা পড়া বিদেশি যোদ্ধা। এখন তারা বন্দি, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
কারাগারে আটক বিদেশিরা
এই বন্দিদের কেউ রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ভালো জীবনের আশায়, কেউ নাগরিকত্বের স্বপ্নে, আবার কেউ নিজের দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচতে। অনেকের ভাষ্য, তারা ঠিকভাবে না বুঝেই সামরিক চুক্তিতে সই করেছিলেন। কেউ বলেন, জোর করে বাধ্য করা হয়েছে। ফল একটাই, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কারাগারে এসে ঠেকেছে তাদের জীবন।
বিনিময়ের অপেক্ষায় দীর্ঘ দিন
এই বন্দিরা জানেন, যুদ্ধবন্দী বিনিময় একমাত্র মুক্তির পথ। কিন্তু সেই বিনিময় আদৌ হবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব বন্দির অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে। সাক্ষাৎকারের সময় ও তাদের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, যুদ্ধবন্দিদের জনসমক্ষে দেখানো নিষিদ্ধ।
কারাগারে নতুন বন্দিরা নীল রঙের পোশাক পান। সঙ্গে দেওয়া হয় সাবান, তোয়ালে আর একটি টুথব্রাশ। এই সামান্য জিনিসেই সীমাবদ্ধ তাদের দৈনন্দিন জীবন।
এরিকের গল্প
টোগোর নাগরিক এরিক পাঁচ বছর আগে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে। সস্তা পড়াশোনা আর নাগরিকত্বের সম্ভাবনা তাকে টেনেছিল। পরে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বেতনও পেয়েছিলেন আগের আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এরিক বলেন, শুরু থেকেই জানতেন তিনি কী করছেন। ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখল নিয়েও তার তেমন আপত্তি ছিল না। ইতিহাস না জানার কথাও স্বীকার করেন তিনি।
কারাগারে এসে তার রুশ ভাষা আরও ভালো হয়েছে। বন্দিদের মধ্যে এই ভাষাই যোগাযোগের মাধ্যম। ধরা পড়ার পর প্রথমবার বাবাকে ফোন করেছিলেন। বাবার রাগ আর হতাশা আজও তার মনে গেঁথে আছে।
দৈনন্দিন নিয়মের শৃঙ্খলা
দুপুরের খাবারের সময় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বন্দিদের। মাথা নিচু, হাত পেছনে। খাবার শেষে একসঙ্গে ধন্যবাদ জানাতে হয়। বিকেলে কেউ কেউ কারাগারের ওয়ার্কশপে কাজ করেন, অল্প মজুরির বিনিময়ে চেয়ার বানান।
ইতালির জিউসেপ্পে
বাইরে দেখা যায় ইতালির নাগরিক জিউসেপ্পেকে। পেশায় পিৎজা রাঁধুনি। স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে তিনি সাইবেরিয়ায় চলে যান। পরে সেনাবাহিনীর রান্নার কাজের বিজ্ঞাপন দেখে যোগ দেন। যুদ্ধের মাঝেই গোলার আঘাতে তার পায়ের আঙুল কেটে যায়। আহত অবস্থায় তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
শ্রীলঙ্কার ওয়েদিওয়েলা
শ্রীলঙ্কার নাগরিক ওয়েদিওয়েলা শুধু কাজের খোঁজে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তার ডায়েরিতে লেখা আছে যুদ্ধের ধ্বংস আর শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার কথা। তবে তিনি মনে করেন, এই যুদ্ধের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর দায়ও আছে। নিজের দেশে ভালো পরিবেশ থাকলে তাকে এই পথে আসতে হতো না, এমন কথাও লিখেছেন তিনি।
জোরপূর্বক চুক্তির অভিযোগ
উজবেকিস্তানের আজিজের দাবি, তাকে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে সামরিক চুক্তিতে সই করানো হয়। কারাগার না সেনাবাহিনী, এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়েছিল তাকে। যুদ্ধ এড়াতে গিয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি জানান, ইউক্রেনীয়দের রুশ অবস্থানের তথ্যও দেখিয়ে দিয়েছেন।
মানবাধিকার ও বাস্তবতা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই পক্ষই বন্দিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ইউক্রেনের বন্দিশিবিরগুলো তুলনামূলকভাবে নিয়ম মেনে চলছে। তবে কিছু বন্দি বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগও করেছেন। ইউক্রেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কিয়েভের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের হাতে ধরা পড়া সৈন্যদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি নাগরিক। রাশিয়া কিংবা তাদের নিজ দেশ কেউই তাদের ফিরিয়ে নিতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর বন্দি থাকার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
নিভে আসা আশা
কেউ কেউ একটি সামগ্রিক বিনিময় পরিকল্পনার আশায় আছেন। কেউ মুক্তি পেলে আবার রাশিয়ায় ফিরতে চান। আবার কেউ নিজের দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে বাঁচতে চান। তবে আশার আলো ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। ওয়েদিওয়েলার ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা, এমন জীবন বাঁচার মতো নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















