উইসকনসিনের ছোট শহর স্টেলায় ২০২২ সালে একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত পুরো জনপদের জীবন বদলে দেয়। রাজ্যের বিজ্ঞানীরা ক্ষতিকর পিএফএএস নামে পরিচিত এক ধরনের বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিকের উপস্থিতি খুঁজতে ব্যক্তিগত পানির কূপ পরীক্ষা করছিলেন। বাড়ির পাশের কূপ পরীক্ষা করার প্রস্তাব পেয়ে ক্রিস্টেন হ্যানেম্যান তেমন গুরুত্ব না দিয়েই সম্মতি দেন। কয়েক মাস পর এক বিষবিজ্ঞানী তাকে ফোন করে অবিলম্বে সেই পানি পান বন্ধ করতে বলেন। তার পরিবারের কূপে চিরস্থায়ী রাসায়নিকের মাত্রা ছিল ফেডারেল সীমার হাজার গুণ বেশি।
স্টেলায় শুধু একটি কূপ নয়, বহু কূপেই একই সমস্যা ধরা পড়ে। একসময় পরিষ্কার হ্রদ আর শিকারের জন্য বিখ্যাত এই এলাকায় এখন মাছ বা হরিণের মাংস খাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্কতা জারি হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও অনেকেই এলাকা ছাড়তে পারছেন না, কারণ দূষণের খবর ছড়িয়ে পড়ায় বাড়ি বিক্রি করাও কঠিন হয়ে গেছে।

চিরস্থায়ী রাসায়নিকের বিস্তার
পিএফএএসকে চিরস্থায়ী বলা হয় কারণ এগুলো পরিবেশে ভাঙে না এবং মানবদেহে জমা হয়—বিশেষ করে লিভার, কিডনি ও রক্তে। গবেষণায় এগুলোর সঙ্গে ক্যান্সার ঝুঁকি ও শিশুদের বিকাশগত সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক পরিবারের পানিতে কোনো না কোনো মাত্রায় এই রাসায়নিক থাকতে পারে বলে সরকারি ধারণা। তবে সরকারি পানি সরবরাহে কঠোর নিয়ম থাকলেও ব্যক্তিগত কূপ ব্যবহারকারী প্রায় চার কোটি মানুষের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ফলে এলোমেলো পরীক্ষা ছাড়া অধিকাংশ মানুষই দূষণের খবর জানতে পারেন না।
দূষণের উৎস ও দায় প্রশ্ন
স্টেলায় দূষণের উৎস খুঁজতে গিয়ে নজরে আসে কাছের একটি কাগজ কারখানা, যেখানে মাইক্রোওয়েভ পপকর্নের তেলরোধী কাগজ তৈরিতে পিএফএএস ব্যবহৃত হতো। উৎপাদনের বর্জ্য কাদা সার হিসেবে আশপাশের জমিতে ছড়ানো হয়েছিল বহু বছর ধরে। এখন ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেই রাসায়নিক মাটির নিচের পানিতে মিশে গেছে। রাজ্য কর্তৃপক্ষ তদন্ত ও পরিষ্কারের দায় নির্ধারণে পদক্ষেপ নিলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বলছে, তারা তৎকালীন নিয়ম মেনেই কাজ করেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আইনি লড়াই

অল্প মাত্রায় দীর্ঘদিন পিএফএএস গ্রহণও বিপজ্জনক হতে পারে। হ্যানেম্যান পরিবারের মতো অনেকেই এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ক্ষতিপূরণ দাবিতে মামলা করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, দূষিত পানির সঙ্গে কোলেস্টেরল, থাইরয়েড ও কিডনি সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। কোম্পানিগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কূপভিত্তিক সংকটের বাস্তবতা
সরকারি পানির মতো কেন্দ্রীয় পরিশোধন ব্যবস্থা না থাকায় ব্যক্তিগত কূপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয় বাড়ি বাড়ি। কোথাও ফিল্টার বসাতে হচ্ছে, কোথাও গভীর কূপ খনন বা শহরের পানির সঙ্গে সংযোগ নিতে হচ্ছে—সবই ব্যয়বহুল। অনেকেই শেষ পর্যন্ত বোতলজাত পানির ওপর নির্ভর করছেন।
অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের অভিজ্ঞতা
উত্তর ক্যারোলাইনা, জর্জিয়া ও মিশিগানসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শিল্পকারখানা ও অগ্নিনির্বাপণ ফোমের কারণে একই ধরনের দূষণ ছড়িয়েছে। কোথাও হাজার হাজার কূপ পরীক্ষা চলছে, কোথাও আংশিক সহায়তা মিলছে। আবার অনেক এলাকায় মানুষ সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে সমস্যার মোকাবিলা করছেন। অর্থসংকট ও নীতিগত জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থায়ন ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা
ফেডারেল তহবিলের বড় অংশ সরকারি পানি ব্যবস্থায় ব্যয় হওয়ায় ব্যক্তিগত কূপ ব্যবহারকারীরা পিছিয়ে পড়ছেন। উইসকনসিনে দূষিত পরিবারের জন্য বোতলজাত পানি সরবরাহেই বছরে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অথচ পরিষ্কার কার্যক্রমের বড় তহবিল রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে আছে।
স্টেলায় নতুন বাস্তবতা
তিন বছরের বেশি সময় ধরে হ্যানেম্যান পরিবারের কূপের দূষণ অপরিবর্তিত রয়েছে। কিছু পরিবার সহায়তা পেলেও অনেকের জন্য নতুন কূপ খননের খরচ বহন করা কঠিন। বাড়ির মূল্য কমে যাওয়া, স্বাস্থ্যঝুঁকি আর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এলাকাবাসীর জীবনে স্থায়ী উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ নতুন কূপে পরিষ্কার পানি পেলেও ভরসা ফিরে পাচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
শিল্পবর্জ্য বা পয়োনিষ্কাশন কাদা কৃষিজমিতে ছড়ালে পিএফএএস আবার মাটিতে ফিরে যেতে পারে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। পর্যাপ্ত পরীক্ষা ছাড়া এ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়াকে তারা বিপজ্জনক মনে করছেন।
স্টেলার দূষণ সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে—চিরস্থায়ী রাসায়নিকের প্রভাব শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎকেও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















