ভারতের সবচেয়ে শীতল ও দুর্গম অঞ্চলের একটি স্পিতি উপত্যকায় একদল স্থানীয় নারী এমন এক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন, যা একসময় কল্পনাতেও ছিল না। এশিয়ার সবচেয়ে দুর্লভ শিকারি প্রাণী তুষারচিতাকে খুঁজে বের করা, নজরদারি করা এবং রক্ষায় ভূমিকা রাখাই এখন তাদের প্রতিদিনের কাজ।
হিমালয় ঘেরা এই উচ্চভূমি মরুভূমিতে তুষার চিতা কে অনেকেই পাহাড়ের ভূত বলে ডাকে, কারণ তারা নিঃশব্দে চলাফেরা করে এবং খুব কমই চোখে পড়ে। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মাত্র বারোটি দেশে এদের উপস্থিতি রয়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপে ভারতে সাত শতাধিক তুষার চিতার অস্তিত্ব ধরা পড়েছে, যা দেশটিকে এই প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাস ভূমিতে পরিণত করেছে।
মানসিকতার বদল ও নতুন দায়িত্ব
একসময় গবাদি পশু শিকারের কারণে গ্রামবাসীর কাছে তুষার চিতা ছিল ভয়ের প্রতীক। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। এখন তারা বুঝতে পারছে পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এই শিকারির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ই রয়েছেন প্রায় এক ডজন নারী, যারা বন বিভাগের সঙ্গে মিলে সংরক্ষণ কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ নিচ্ছেন।

প্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি
প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা পাহাড়ি পথে ক্যামেরা স্থাপন করেন, যা নির্দিষ্ট সংকেতে তুষার চিতার ছবি তুলে সংরক্ষণ করে। বরফে ঢাকা কঠিন পরিবেশে ভোরে ঘুম থেকে উঠে গৃহস্থালি কাজ শেষ করে তারা দীর্ঘ পথ হেঁটে এসব স্থানে পৌঁছান। অনেক ক্ষেত্রেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চৌদ্দ হাজার ফুটের ও বেশি উচ্চতায় কাজ করতে হয়, যেখানে স্বাভাবিক চলাচল ও কষ্টকর।
জরিপে মিলল নতুন তথ্য
ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবির মাধ্যমে প্রতিটি তুষারচিতাকে আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে হিমাচল অঞ্চলে তুষার চিতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানা গেছে। এই তথ্য ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ পরিকল্পনা ও আবাসস্থল ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ভয় থেকে সহমর্মিতা
শুরুতে এই কাজে নারীদের আগ্রহ কম ছিল, আয়ের একটি ছোট সুযোগই তাদের আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রাণীটির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। এখন তারা শুধু জরিপই করছেন না, গ্রামবাসীকে গবাদিপশুর বীমা সুবিধা পেতে সহায়তা করছেন এবং নিরাপদ খোঁয়াড় ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছেন, যাতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমে।
পরিবর্তিত জলবায়ুতে নতুন আশার পথ
স্পিতি অঞ্চলকে সম্প্রতি শীতল মরু জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষা ও স্থানীয় জীবিকা টিকিয়ে রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে থাকা এই পার্বত্য অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণই দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
নিজ ভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
এই নারীদের কাছে কাজটি শুধু দায়িত্ব নয়, নিজের পাহাড়, গ্রাম আর শিকড়ের সঙ্গে নতুন করে সংযোগের অনুভূতি। তুষারচিতার ভয় এখনও পুরোপুরি কাটেনি, তবু তারা বিশ্বাস করেন এই পাহাড় ই তাদের ঘর, আর সেই ঘর রক্ষার অংশ হিসেবেই তুষার চিতা কে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















