ইতালির তিভোলি শহরের খনিগুলো একসময় প্রাচীন রোমের মন্দির, অ্যাম্ফিথিয়েটার ও বিশাল স্থাপনা নির্মাণে পাথর জোগাত। দুই হাজার বছর আগে এখান থেকেই কাটা হয়েছিল বিখ্যাত কলোসিয়ামের পাথর। শতাব্দী পরে এখানকার একই ট্রাভারটিন দিয়ে নির্মিত হয় সেন্ট পিটার্স বাসিলিকা ও বার্নিনির ঐতিহাসিক কলোনেড। সময় বদলেছে, কিন্তু খনিগুলোর গুরুত্ব কমেনি—আজও সেখানকার পাথর বিশ্বজুড়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিভোলির খনি থেকে বিশ্ববাজারে
প্রাচীন রোমানরা নতুন মন্দির নির্মাণের সময় কাছের তিভোলির খনি থেকে ল্যাপিস টিবুরটিনাস নামের ছিদ্রযুক্ত পাথর কাটতেন, যা এখন ট্রাভারটিন নামে পরিচিত। পাথরগুলো ভেলায় করে শহরে এনে কারিগররা নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতেন।
বর্তমানে সেই ঐতিহাসিক খনিগুলো থেকেই নতুন প্রজন্মের চার্চ, মন্দির, মসজিদ, ব্যাংক, জাদুঘর, সরকারি ভবন ও ব্যক্তিগত বাড়ির জন্য পাথর সরবরাহ হচ্ছে। ইতালির বাইরে বিভিন্ন দেশে ট্রাভারটিন পাওয়া গেলেও তিভোলির ট্রাভারটিনকে আলাদা করে দেখা হয়।
কেন আলাদা তিভোলির ট্রাভারটিন
এই পাথর মূলত সালফারসমৃদ্ধ ভূগর্ভস্থ ঝরনা ও জলাধারে তৈরি হয়েছে। ক্যালসিয়াম কার্বোনেটসহ নানা খনিজের স্তর জমে কয়েক লাখ বছরে এর গঠন সম্পন্ন হয়। স্তরগুলোর ভেতরে আগ্নেয়গিরির ইতিহাস, বনাঞ্চলের চিহ্ন ও জীবাশ্মের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
স্থপতিদের কাছে ট্রাভারটিন জনপ্রিয় হওয়ার কারণও স্পষ্ট। এটি শক্ত, সহজলভ্য এবং আবহাওয়া বা পরিবেশগত ক্ষয় সহ্য করতে পারে। কাটার ধরন অনুযায়ী এর রং ও টেক্সচার বদলায়—কখনও উষ্ণ সাদা, কখনও বালুময় বেইজ, আবার কোথাও ধূসর, বাদামি বা সবুজাভ শিরা দেখা যায়।
পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বজোড়া কাজ
চার প্রজন্ম ধরে মারিওত্তি কার্লো স্পা নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই ট্রাভারটিন কেটে সরবরাহ করছে। তাদের কাজের তালিকায় রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেসের গেটি সেন্টার, বেইজিংয়ে ব্যাংক অব চায়নার সদর দপ্তর এবং আলজিয়ার্সের গ্রেট মসজিদ।
সম্প্রতি তাদের তিভোলির গুদামে সাজানো অবস্থায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পুনর্নির্মাণাধীন একটি ল্যাটার-ডে সেইন্ট মন্দিরের জন্য তৈরি ট্রাভারটিনের অংশ। আগে রোমের মন্দিরে পাথর সরবরাহের পর এবার ম্যানহাটনের আপার ওয়েস্ট সাইডের মন্দির সংস্কারের দায়িত্বও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফাব্রিজিও মারিওত্তি বলেন, ট্রাভারটিন বিশ্বের কাছে এক ক্লাসিক পাথর। এর আলো প্রতিফলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য যেন রোমের আলোকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে পৌঁছে দেয়।
বার্নিনির পছন্দের খনি
তিভোলির ডেগেমার খনির বাতাসে এখনও সালফারের তীব্র গন্ধ ভাসে, আর বিশাল জ্যাকহ্যামারের শব্দে কাঁপে চারপাশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৩০ মিটার নিচ পর্যন্ত খনন করা এই এলাকায় নীলাভ সালফার পানির পুকুরের পাশ দিয়ে ৩৩ টন ওজনের পাথরের স্ল্যাব ট্রাকে তুলে আনা হয়।
সতেরো শতকের বিখ্যাত ভাস্কর ও স্থপতি জিয়ান লরেঞ্জো বার্নিনি এখান থেকেই সেন্ট পিটার্স স্কয়ারের ২৮৪টি কলাম ও ৮৮টি স্তম্ভের জন্য উজ্জ্বল সাদা ট্রাভারটিন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি এত সময় এখানে কাটাতেন যে খনির ওপর দৃষ্টি রাখার জন্য একটি বাড়িও তৈরি করেছিলেন, যা আজও দাঁড়িয়ে আছে।
বর্তমানে এই খনি থেকে সৌদি আরবের রিয়াদের নতুন বিমানবন্দর এবং চীনের শেনঝেনে শাসক দলের নতুন সদর দপ্তরসহ নানা প্রকল্পে পাথর যাচ্ছে।
খনির মালিক ভিনচেঞ্জো দে জেন্নারোর ভাষায়, ট্রাভারটিন এক ধরনের ‘জীবন্ত পাথর’, যা খনিজসমৃদ্ধ পানির মিশ্রণে জন্ম নেয়—এটাই একে বিশেষ করে তোলে।
দুই হাজার বছরের পরীক্ষিত স্থায়িত্ব
ট্রাভারটিনের টেকসই হওয়া নিয়ে সন্দেহের সুযোগ নেই বলেই দাবি সংশ্লিষ্টদের। তারা উদাহরণ দেন—প্রাচীন রোমের বহু স্থাপনা দুই হাজার বছর ধরে দিব্যি টিকে আছে।
রোমের লা সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যাপক মার্কো ফেরেরো বলেন, ট্রাভারটিনের আকর্ষণ শুধু শক্তিতে নয়; এটি প্রাচীন রোমের ঐতিহ্য ও ক্লাসিক বিশ্বের আবহ বহন করে। তার মতে, মার্বেলের মতো ঝাঁ চকচকে না হলেও ট্রাভারটিন বেশি টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ।
তিনি তুলনা টেনে বলেন, মার্বেল যেন সাহিত্যিক ইতালীয় ভাষায় কথা বলে, আর ট্রাভারটিন কথা বলে রোমান উপভাষায়। অর্থাৎ এটি সরল, প্রামাণিক এবং ঐতিহ্যবাহী—ঠিক রোমান রান্নার মতোই।
এই ঐতিহ্যই আজও তিভোলির খনিগুলোকে ব্যস্ত রাখছে, যেখানে প্রাচীন রোমের গৌরব বয়ে নিয়ে নতুন বিশ্বের স্থাপত্য গড়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
























