রমজান আত্মিক শুদ্ধির মাস। তবে রোজার সময় ঘুম, পানি পান ও খাবারের সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন আসে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব দ্রুতই পড়ে ত্বক ও চুলে। ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, উজ্জ্বলতা কমে, ব্রণ বেড়ে যায়, এমনকি চুল পড়াও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য সচেতনতা ও সঠিক যত্ন নিলে পুরো মাসজুড়েই ত্বকের ঔজ্জ্বল্য ও চুলের শক্তি ধরে রাখা সম্ভব।
ত্বক কেন নিস্তেজ হয়ে যায়
রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ পানি না খাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে ত্বকের সুরক্ষা স্তর দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে ত্বক থেকে আর্দ্রতা দ্রুত হারায় এবং প্রদাহ বাড়ে। ব্যাকটেরিয়া সহজে প্রবেশ করে ব্রণের ঝুঁকি বাড়ায়। ইফতারে অতিরিক্ত মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খাবার খেলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়, ফলে ত্বকে তেল উৎপাদন বাড়ে এবং ব্রণ আরও তীব্র হয়। অনেকেই এই সময় ব্রণের ওষুধ বন্ধ করে দেন বা অতিরিক্ত মুখ ধুয়ে ত্বকের ক্ষতি করেন, যা সমস্যাকে আরও বাড়ায়। অতিরিক্ত দুগ্ধজাত খাবারও ব্রণ বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে।
পানি পানের কৌশলই প্রথম শর্ত
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়টুকুই শরীরের পানির ঘাটতি পূরণের সুযোগ। পর্যাপ্ত পানি পান করলে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় থাকে, শুষ্কতা কমে এবং মাথার ত্বকও সুষম থাকে। এতে চুল শক্ত ও স্বাস্থ্যবান হয়। শুধু পানি নয়, শসা, তরমুজ, স্যুপ ও তাজা ফলের মতো পানি সমৃদ্ধ খাবারও রাখতে হবে খাদ্যতালিকায়। ভেতর থেকে যত্ন নিলেই বাইরে তার ছাপ স্পষ্ট হয়।
সুষম খাবারেই ত্বক ও চুলের সুরক্ষা
রমজানে ইফতারে ভারী খাবার আর সেহরিতে হালকা খাবারের প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু খাবারের মান সরাসরি প্রভাব ফেলে ত্বক ও চুলে। পর্যাপ্ত প্রোটিন ত্বকের কোলাজেন ও চুলের কেরাটিন গঠনে সহায়তা করে, ফলে চুল পড়া কমে। স্বাস্থ্যকর চর্বি ত্বকের সুরক্ষা স্তর মজবুত রাখে এবং প্রদাহ কমায়। শাকসবজি ও ফলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে উজ্জ্বল রাখে ও অকাল বার্ধক্য রোধ করে। লৌহ, জিঙ্ক, ভিটামিন সি ও বায়োটিন ত্বক ও চুলের জন্য অত্যন্ত জরুরি পুষ্টি উপাদান।
অতিরিক্ত চিনি, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার যত কম খাওয়া যায় ততই ভালো। এসব খাবার ইনসুলিন বাড়িয়ে ব্রণ, ত্বকের নিস্তেজ ভাব ও শক্তিহীনতা ডেকে আনে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পুষ্টিকর খাবারই ত্বক ও চুলের জন্য ভেতর থেকে পরিচর্যা।
ত্বকের নিয়মিত যত্নে ধারাবাহিকতা জরুরি
রোজার কারণে দৈনন্দিন রুটিন বদলালেও ত্বকের যত্ন বন্ধ করা যাবে না। মৃদু ক্লিনজার, আর্দ্রতা রক্ষাকারী ক্রিম ও নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার জরুরি। ত্বক বেশি শুষ্ক হলে রাতে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ সিরাম বা ঘন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার উপকারী হতে পারে। তবে এই সময়ে শক্তিশালী এক্সফোলিয়েশন বা তীব্র রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে আনা ভালো। রেটিনল বা কেমিক্যাল পিলের ব্যবহার সীমিত রাখলে ত্বকের সুরক্ষা স্তর অক্ষত থাকে।
ঠোঁট ফাটা এড়াতে কী করবেন
দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ায় ঠোঁট দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়। ইফতারের পর ও সেহরির আগে নিয়মিত লিপ বাম ব্যবহার করলে ঠোঁট নরম ও সুরক্ষিত থাকে। সহজ এই অভ্যাসই বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
চুলের যত্নে মাথার ত্বকেই গুরুত্ব
চুলের স্বাস্থ্য শুরু হয় মাথার ত্বক থেকে। রোজার সময় আর্দ্রতার ওঠানামায় মাথার ত্বক কখনও বেশি শুষ্ক, কখনও বেশি তৈলাক্ত হয়ে পড়তে পারে। তাই চুলের ধরন অনুযায়ী সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার মৃদু শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত। সালফেটমুক্ত শ্যাম্পু আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত তেল ব্যবহার মাথার ত্বক পুষ্ট করে এবং চুলের গোড়া মজবুত করে। সপ্তাহে একবার গভীর কন্ডিশনিং চুলের শুষ্কতা কমায় ও ভাঙন রোধ করে।
রমজানে শরীর নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় নেয়। শুরুতে ত্বক ও চুলে সামান্য পরিবর্তন দেখা দিলেও আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিয়মিত যত্ন, সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত পানি পানই পারে পুরো মাসজুড়ে ত্বক ও চুলকে সুস্থ রাখতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
























