লোকসানের ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন দেশের আলুচাষিরা। গত মৌসুমে দামের ধসে বহু কৃষক ঋণের বোঝা কাঁধে নেন, কেউ জমি বন্ধক রাখেন। সেই প্রেক্ষাপটে প্রণোদনার ঘোষণা এলেও তিন মাস পেরিয়ে এক মৌসুম শেষ হয়ে আরেক মৌসুম শুরু হলেও কৃষকের হাতে সেই অর্থ পৌঁছায়নি। ফলে উত্তরাঞ্চলজুড়ে আবারও লোকসানের চক্র ঘুরতে শুরু করেছে।

প্রণোদনার ঘোষণা, বাস্তবায়ন শূন্য
গত নভেম্বরে ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিদের সহায়তায় প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি আরও ১১০ কোটি টাকা ভর্তুকির সিদ্ধান্ত হয়। মাঠ পর্যায়ে কৃষকের তালিকাও তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কৃষক প্রণোদনার টাকা পাননি। প্রস্তাবনা বিভিন্ন দপ্তর ঘুরলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
এর আগে দাম স্থিতিশীল রাখতে ৫০ হাজার টন আলু সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি। একইভাবে হিমাগারের ফটকে কেজিপ্রতি ২২ টাকা ন্যূনতম দর নির্ধারণের ঘোষণাও কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

বাজারে ধস, মাঠে পড়ে আলু
নতুন আলু বাজারে এলেও হিমাগারে পুরোনো আলুর বড় মজুত থাকায় সরবরাহ বেড়েছে। ফলে অনেক এলাকায় কেজিপ্রতি দাম নেমে এসেছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়, কোথাও চার থেকে ছয় টাকায়। ঠাকুরগাঁও ও রংপুর অঞ্চলে এমন চিত্র আরও প্রকট। উৎপাদন খরচ যেখানে কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ১৬ টাকা, সেখানে বিক্রি হচ্ছে চার থেকে ছয় টাকায়। ফলে প্রতি কেজিতে ৯ থেকে ১১ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনছেন কৃষকরা।
অনেক স্থানে আলু বিক্রি না হওয়ায় মাঠেই পড়ে আছে। কোথাও আবার গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাজার আছে, ফসল আছে, কিন্তু ন্যায্যমূল্য নেই—এই বাস্তবতা এখন হাটবাজারের প্রতিদিনের দৃশ্য।

বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা ঘাটতি
মাঠ পর্যায়ের হিসাবে এক বিঘা জমিতে আলু চাষে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। বীজেই লাগে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে ৭৫ থেকে ৮৫ মণ আলু পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান দরে বিক্রি করে আয় হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। ফলে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা ঘাটতি থাকছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মৌসুমে বগুড়া, জয়পুরহাট ও রংপুর অঞ্চলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল না পেয়ে উল্টো বাজারদরের ধসের কারণে গত দুই মৌসুমে এই তিন জেলাতেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

হিমাগারে অনীহা, ঋণের ফাঁদে কৃষক
উত্তরাঞ্চলে ১০৬টি হিমাগার থাকলেও সংরক্ষণ ব্যয় বেশি হওয়ায় অধিকাংশ কৃষক সেখানে আলু রাখতে পারছেন না। মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ভাড়া, সঙ্গে পরিবহন ও সুদের চাপ মিলিয়ে খরচ আরও বাড়ছে। গত বছরের অভিজ্ঞতায় অনেকেই এবার হিমাগারে আলু রাখতে আগ্রহ হারিয়েছেন। কেউ কেউ আগের লোকসান পুষিয়ে নিতে গিয়ে আবারও নতুন ঋণে জড়িয়েছেন।
কৃষকের ভাষ্য, আলু চাষ করে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠছে না। একের পর এক মৌসুমে লোকসান গুনে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, ঘোষিত সরকারি ক্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হওয়া, ন্যূনতম দাম নিশ্চিত না করা এবং সময়মতো প্রণোদনা না দেওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। পরিকল্পিত উৎপাদন, কার্যকর ক্রয়, উন্নত সংরক্ষণ ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়। শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপেই কৃষক বাঁচতে পারেন—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















