একজন স্ত্রী যদি উপার্জন না-ও করেন, তবু তিনি সংসারে অবদান রাখেন। দিল্লি হাই কোর্ট গৃহিণীদের ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে যে মন্তব্য করেছে, তা নিঃসন্দেহে স্বাগত। স্বামীর থেকে আলাদা থাকা এক স্ত্রীর ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে বিচারপতি স্বর্ণকান্ত শর্মা বলেন, স্ত্রী কর্মজীবী নন মানেই তিনি অলস—এমন ধারণা সঠিক নয়।
বিচারপতি শর্মা পর্যবেক্ষণে জানান, একটি সংসার পরিচালনা করা, সন্তানদের লালন-পালন করা, পরিবারের পাশে থাকা এবং উপার্জনকারী সঙ্গীর চাকরি ও বদলির সঙ্গে নিজের জীবনকে খাপ খাইয়ে নেওয়া—এসবই কাজের অন্তর্ভুক্ত। এই কাজের জন্য কোনও পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না, প্রায়ই তা স্বীকৃতিও পায় না। অথচ এই অদৃশ্য কাঠামোর ওপরই অসংখ্য পরিবার টিকে থাকে।
নারীবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আদালতের এই মন্তব্য বহুদিনের দাবিকে নতুন করে সামনে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরেই নারীবাদী অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের দেখভাল—এই অবৈতনিক যত্নের কাজগুলো মূলত নারীদের ওপরই বর্তায়, তারা কর্মজীবী হোন বা না-হোন।

২০২৪ সালের ‘টাইম ইউজ সার্ভে’-এর তথ্য এই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে। সমীক্ষা অনুযায়ী, নারীরা প্রতিদিন গড়ে ২৮৯ মিনিট অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন এবং আরও ১৩৭ মিনিট যত্নমূলক কাজে দেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে গৃহস্থালি কাজে সময় ব্যয় ৮৮ মিনিট এবং যত্নমূলক কাজে ৭৫ মিনিট।
এই বিশাল সময় ব্যবধানই বেতনভুক্ত কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণের ফারাক ব্যাখ্যা করে। সহজ ভাষায় বললে, একজন নারী যত বেশি সময় ঘরের অবৈতনিক কাজে ব্যয় করেন, বাইরে বেতনভুক্ত কাজের জন্য তাঁর সময় তত কমে যায়।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী পুরুষদের ৭৫ শতাংশ বেতনভুক্ত কাজে যুক্ত, অথচ একই বয়সী নারীদের মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ এই ধরনের কাজে অংশ নেন।
শ্রমের মহিমাকীর্তন
অবৈতনিক যত্নের কাজকে শুধু নারীর দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হয় না, জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তা অনেক সময় মহিমান্বিতও করা হয়। যেমন, “মায়ের হাতের রান্না”—এই আবেগঘন ধারণা সমাজে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত।
বি-র শাশুড়ির ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই তাঁর শুশ্রূষা করেছেন। পরিবারে নার্স রাখার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বামী চাননি তাঁর মায়ের দেখভাল কোনও বাইরের মানুষ করুক। তিনি চেয়েছিলেন, এই দায়িত্ব পালন করুক তাঁর স্ত্রী।

এস প্রথম সন্তানের জন্মের পর মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান। কিন্তু কাজে ফেরার সময় এলে তিনি দ্বিধায় পড়েন। স্বামী সাহায্য করতেন, বাড়িতেও নির্ভরযোগ্য সহায়তা ছিল। তবু দীর্ঘ সময় অফিসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দেন। কখনও কি অনুশোচনা হয়? মাঝেমধ্যে হয়তো হয়। তবে তিনি সন্তুষ্ট যে তাঁর মেয়ে এখন নিজের কর্মজীবনে সফল।
মাতৃত্বের মূল্য অনেক সময় কর্মজীবনে চড়া দামে দিতে হয়। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ৯০টি দেশের ওপর করা এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সি সন্তানের মায়েদের কর্মসংস্থানের হার মাত্র ৪৭.৬ শতাংশ। তুলনায় বাবাদের ক্ষেত্রে তা ৮৭.৯ শতাংশ এবং যেসব নারীর সন্তান নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে ৫৪.৪ শতাংশ।
তাহলে যত্নের কাজের কি কোনও অর্থনৈতিক মূল্য আছে? ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অবৈতনিক যত্নের কাজ ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের ১৫ থেকে ১৭ শতাংশের সমান মূল্য বহন করে। ২০১৫ সালে এক গবেষণায় অনুমান করা হয়েছিল, যদি নারীদের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ পুরুষদের সমান হয়, তবে এক দশকে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদন ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কোভিড মহামারির সময় লকডাউনে বাড়ি থেকে কাজের প্রেক্ষাপটে যত্নের কাজের গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। কিছু সময়ের জন্য পুরুষরা স্ত্রীর কাজে সহায়তা বাড়িয়েছিলেন বলে অর্থনীতিবিদ অশ্বিনী দেশপান্ডে উল্লেখ করেন। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই আবার আগের চিত্রে ফিরে যায় সমাজ।
নমিতা ভান্ডারে 























