০৭:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
তেলবাহী জাহাজকে এখনই নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত নয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রথম বার্তা শিগগির প্রকাশ পাটুরিয়ায় নদীতে পড়া তেলবাহী ট্রাক উদ্ধার অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য তদন্তে অন্তর্ভুক্তি ‘অস্বস্তিকর’, তবে বড় চ্যালেঞ্জ নয়: বিজিএমইএ সভাপতি রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট নরসিংদীতে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, প্রাপকেরা পাচ্ছেন কম ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড সভায় ব্যবসার অগ্রগতি পর্যালোচনা, নেওয়া হলো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ঢাকার সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ছয় ঘণ্টা পর স্বাভাবিক দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা ও সুশাসন জোরদারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কী করছে বাংলাদেশ?

  • সজল দাস
  • ০৫:৩১:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
  • 15

জ্বালানি তেল নিতে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

জ্বালানি নিতে ঢাকায় ফিলিং স্টেশনের সামনে লম্বা লাইনে যানবাহনের অপেক্ষা। কখনো লাইনে দাড়ানো নিয়ে বাকবিতণ্ডা, আবার কখনো চাহিদা মতো জ্বালানি না পেয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ উঠছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ‘আপাতত জ্বালানি সংকট নেই’ এমন বার্তা দেওয়া হলেও অস্থিরতা কাটেনি। বরং জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তার শঙ্কায় ফিলিং স্টেশনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন অনেকে।

গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিস্থিতি অনেকটা এমনই।

কেবল বাংলাদেশ নয়, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর পর থেকেই জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে গোটা বিশ্বেই।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে জ্বালানি নিয়ে শঙ্কা অমূলক নয় বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। অনেকেই বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি নিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

এক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তাটা বেশি বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আগেভাগেই প্রস্তুতি না থাকলে সংকট মোকাবেলা কঠিন হতে পারে।

তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত কয়েকদিনে জ্বালানি নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কতটা কমেছে তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, সংকট মোকাবিলায় ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

“জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা শিগগিরই কেটে যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরশন বা বিপিসি বলছে, দেশেই উৎপাদন হওয়ায় পেট্রোল বা অকটেন সংকটের শঙ্কা নেই। তারপরও জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভীড় করছেন অনেকে।

ডিজেল নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিকল্প উৎসের খোঁজ চলছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে, জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে এরইমধ্যে ভারতকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা।

 বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে কথা বলছে বাংলাদেশ

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে কথা বলছে বাংলাদেশ

বিকল্প উৎসের খোঁজে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌযান চলাচলে ইরানের নিষেধাজ্ঞার পর বিশ্বব্যাপি জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের বলেছেন, হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকলে বিশ্বে “বিপর্যয়কর পরিণতি” হতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটে সংকট মেটাতে বিকল্প উৎসের খোঁজে বাংলাদেশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের কাছে আগামী চার মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে ঢাকা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, “তারা আমাদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে। এখন তো তারাও সংকটে আছে,” বলেন তিনি।

অবশ্য বিপিসি ও ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের মধ্যে আগের একটি চুক্তির আওতায় পাঁচ হাজার টন ডিজেল বুধবার বাংলাদেশে এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালে হওয়া ওই চুক্তি অনুসারে ২০২৬ সালে মোট এক লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীনের সহায়তাও চেয়েছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এর সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

মি. টুকু বলছেন, জ্বালানি আমদানির জন্য বিকল্প উৎসের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার।

“যা যা করার দরকার সবটাই করছি আমরা। আমরা স্পট পার্চেজ করছি। আমারে কাছে যে তেল আছে তা দিয়ে আমি চালাতে পারবো, মানুষকে একটু সাশ্রয়ি হতে হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

চীন এবং ভারত ছাড়াও ব্রুনেই, আফ্রিকা ও আমেরিকা থেকেও জ্বালানি তেল আনার ব্যাপারে সরকার আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী।

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে গড়ে ১৫ জাহাজ জ্বালানি প্রতি মাসে বাংলাদেশে আসে।

“যুদ্ধ শুরুর পর চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ছয়টি জাহাজ এসে পৌঁছেছে। বাকি জাহাজগুলো সময়মতো আসে কিনা এটাই দেখার বিষয়। পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি এখনও কোনো সরবরাহকারি পরিবর্তন করেনি,” বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি তেল না থাকার বার্তা দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন

জ্বালানি তেল না থাকার বার্তা দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন

‘জ্বালানি রেশনিং’ কতদিন চলবে?

“প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাড়ানোর পর বাইকে ২৫০ টাকার তেল দিল, প্রতিদিনই এভাবে লাইনে দাড়াচ্ছি তেল নেওয়ার জন্য।”

বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন ঢাকার রামপুরা এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা মোকাবেলায় ‘সাশ্রয়ী ব্যবহার’ এর উপর শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

পরিস্থিতি সামলাতে গত পাঁচই মার্চ ১১ দফা নির্দেশনাও দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। যেখানে গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা পরিহারসহ নানা নির্দেশনা ছিল।

এছাড়া ‘প্যানিক বাইং’ বন্ধে যানবাহন ভেদে দৈনিক কতটুকু জ্বালানি নেওয়া যাবে সেটিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

অবশ্য জ্বালানি রেশনিং করতে গিয়ে দেশের বেশ কিছু স্থানে তেলের নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং লাইনে দাড়ানোসহ নানা কারণে বাকবিতণ্ডা এবং মারপিটের খবরও পাওয়া গেছে।

এমনকি অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পেট্রোল পাম্পগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি নিরাপত্তা ও টহল জোরদারের দাবিও জানিয়েছেন ফিলিং স্টেশন মালিকরা।

এদিকে, বুধবার নিজেদের সবশেষ বার্তায় বিভাগীয় পর্যায়ে তেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি।

যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “দেশের বিভাগীয় শহরে জ্বালানি তেল (অকটেন ও পেট্রোল) এর গড় বিক্রয় হতে ২৫ শতাংশ হ্রাস এর পরিবর্তে বর্তমানে ১৫ শতাংশ হ্রাস করে ফিলিং স্টেশন প্রতি বরাদ্দ চার্ট অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হবে।”

এছাড়া, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের পার্সেল নির্ধারিত সময়ে নিয়মিতভাবেই দেশে আনা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে বিপিসি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, জ্বালানির মজুদ বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস থেকে প্রাপ্তি সাপেক্ষে ধীরে ধীরে জ্বালানি রেশনিং প্রক্রিয়া শিথিল করা হবে।

“রেশনিং সব দেশেই হয়, ক্রাইসিস মোমেন্টে। দাম এখনই বাড়াচ্ছি না, তবে টেম্পরারিলি দাম আমাদের বাড়াতে হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম।

তিনি বলছেন, “পর্যাপ্ত জ্বালানি যেসব দেশের হাতে রয়েছে তাদের সিদ্ধান্ত আর আমাদের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া এক হবে না, অপশন কম।”

“সরকারকে কিছুটা টাইট স্টেপ তো নিতেই হতো, অযাচিত কোনো পদক্ষেপ তো এখনও চোখে পড়েনি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট বাড়ছে

হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট বাড়ছে

‘উদ্বেগ’ গোটা বিশ্বেই

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির দুই সপ্তাহ না যেতেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।

যদিও মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের যুদ্ধ “প্রায় সম্পন্ন” বলে মন্তব্য করার পর তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ করেই ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে।

বুধবার তেলের দামের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলারের আশপাশেই রয়েছে। সব মিলিয়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত।

এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী তেল বাজার স্থিতিশীল করার বিকল্প উপায় নিয়ে জি-৭ দেশগুলোর সাথে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ।

জি-৭ দেশগুলো জানিয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ মোকাবেলায় “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে প্রস্তুত তারা।

যদিও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে জ্বালানি সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম মজুদধারী দেশ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

এদিকে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রধান উৎপাদক কাতার, উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেলের চেয়েও এলএনজির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইউরোপ এবং এশিয়ার দেশগুলোতে যার প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। মার্চের শুরু থেকেই শিল্প কারখানায় ২০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ কমিয়েছে ভারত।

জ্বালানির দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় স্কুল বন্ধ ঘোষণা এবং সরকারি কর্মচারিদের জ্বালানি ভাতা কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তানও।

 

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

তেলবাহী জাহাজকে এখনই নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত নয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কী করছে বাংলাদেশ?

০৫:৩১:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

জ্বালানি নিতে ঢাকায় ফিলিং স্টেশনের সামনে লম্বা লাইনে যানবাহনের অপেক্ষা। কখনো লাইনে দাড়ানো নিয়ে বাকবিতণ্ডা, আবার কখনো চাহিদা মতো জ্বালানি না পেয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ উঠছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ‘আপাতত জ্বালানি সংকট নেই’ এমন বার্তা দেওয়া হলেও অস্থিরতা কাটেনি। বরং জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তার শঙ্কায় ফিলিং স্টেশনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন অনেকে।

গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিস্থিতি অনেকটা এমনই।

কেবল বাংলাদেশ নয়, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর পর থেকেই জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে গোটা বিশ্বেই।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে জ্বালানি নিয়ে শঙ্কা অমূলক নয় বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। অনেকেই বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি নিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

এক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তাটা বেশি বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আগেভাগেই প্রস্তুতি না থাকলে সংকট মোকাবেলা কঠিন হতে পারে।

তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত কয়েকদিনে জ্বালানি নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কতটা কমেছে তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, সংকট মোকাবিলায় ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

“জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা শিগগিরই কেটে যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরশন বা বিপিসি বলছে, দেশেই উৎপাদন হওয়ায় পেট্রোল বা অকটেন সংকটের শঙ্কা নেই। তারপরও জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভীড় করছেন অনেকে।

ডিজেল নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিকল্প উৎসের খোঁজ চলছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে, জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে এরইমধ্যে ভারতকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা।

 বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে কথা বলছে বাংলাদেশ

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে কথা বলছে বাংলাদেশ

বিকল্প উৎসের খোঁজে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌযান চলাচলে ইরানের নিষেধাজ্ঞার পর বিশ্বব্যাপি জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের বলেছেন, হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকলে বিশ্বে “বিপর্যয়কর পরিণতি” হতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটে সংকট মেটাতে বিকল্প উৎসের খোঁজে বাংলাদেশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের কাছে আগামী চার মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে ঢাকা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, “তারা আমাদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে। এখন তো তারাও সংকটে আছে,” বলেন তিনি।

অবশ্য বিপিসি ও ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের মধ্যে আগের একটি চুক্তির আওতায় পাঁচ হাজার টন ডিজেল বুধবার বাংলাদেশে এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালে হওয়া ওই চুক্তি অনুসারে ২০২৬ সালে মোট এক লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীনের সহায়তাও চেয়েছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এর সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

মি. টুকু বলছেন, জ্বালানি আমদানির জন্য বিকল্প উৎসের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার।

“যা যা করার দরকার সবটাই করছি আমরা। আমরা স্পট পার্চেজ করছি। আমারে কাছে যে তেল আছে তা দিয়ে আমি চালাতে পারবো, মানুষকে একটু সাশ্রয়ি হতে হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

চীন এবং ভারত ছাড়াও ব্রুনেই, আফ্রিকা ও আমেরিকা থেকেও জ্বালানি তেল আনার ব্যাপারে সরকার আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী।

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে গড়ে ১৫ জাহাজ জ্বালানি প্রতি মাসে বাংলাদেশে আসে।

“যুদ্ধ শুরুর পর চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ছয়টি জাহাজ এসে পৌঁছেছে। বাকি জাহাজগুলো সময়মতো আসে কিনা এটাই দেখার বিষয়। পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি এখনও কোনো সরবরাহকারি পরিবর্তন করেনি,” বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি তেল না থাকার বার্তা দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন

জ্বালানি তেল না থাকার বার্তা দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন

‘জ্বালানি রেশনিং’ কতদিন চলবে?

“প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাড়ানোর পর বাইকে ২৫০ টাকার তেল দিল, প্রতিদিনই এভাবে লাইনে দাড়াচ্ছি তেল নেওয়ার জন্য।”

বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন ঢাকার রামপুরা এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা মোকাবেলায় ‘সাশ্রয়ী ব্যবহার’ এর উপর শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

পরিস্থিতি সামলাতে গত পাঁচই মার্চ ১১ দফা নির্দেশনাও দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। যেখানে গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা পরিহারসহ নানা নির্দেশনা ছিল।

এছাড়া ‘প্যানিক বাইং’ বন্ধে যানবাহন ভেদে দৈনিক কতটুকু জ্বালানি নেওয়া যাবে সেটিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

অবশ্য জ্বালানি রেশনিং করতে গিয়ে দেশের বেশ কিছু স্থানে তেলের নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং লাইনে দাড়ানোসহ নানা কারণে বাকবিতণ্ডা এবং মারপিটের খবরও পাওয়া গেছে।

এমনকি অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পেট্রোল পাম্পগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি নিরাপত্তা ও টহল জোরদারের দাবিও জানিয়েছেন ফিলিং স্টেশন মালিকরা।

এদিকে, বুধবার নিজেদের সবশেষ বার্তায় বিভাগীয় পর্যায়ে তেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি।

যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “দেশের বিভাগীয় শহরে জ্বালানি তেল (অকটেন ও পেট্রোল) এর গড় বিক্রয় হতে ২৫ শতাংশ হ্রাস এর পরিবর্তে বর্তমানে ১৫ শতাংশ হ্রাস করে ফিলিং স্টেশন প্রতি বরাদ্দ চার্ট অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হবে।”

এছাড়া, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের পার্সেল নির্ধারিত সময়ে নিয়মিতভাবেই দেশে আনা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে বিপিসি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, জ্বালানির মজুদ বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস থেকে প্রাপ্তি সাপেক্ষে ধীরে ধীরে জ্বালানি রেশনিং প্রক্রিয়া শিথিল করা হবে।

“রেশনিং সব দেশেই হয়, ক্রাইসিস মোমেন্টে। দাম এখনই বাড়াচ্ছি না, তবে টেম্পরারিলি দাম আমাদের বাড়াতে হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম।

তিনি বলছেন, “পর্যাপ্ত জ্বালানি যেসব দেশের হাতে রয়েছে তাদের সিদ্ধান্ত আর আমাদের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া এক হবে না, অপশন কম।”

“সরকারকে কিছুটা টাইট স্টেপ তো নিতেই হতো, অযাচিত কোনো পদক্ষেপ তো এখনও চোখে পড়েনি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট বাড়ছে

হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট বাড়ছে

‘উদ্বেগ’ গোটা বিশ্বেই

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির দুই সপ্তাহ না যেতেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।

যদিও মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের যুদ্ধ “প্রায় সম্পন্ন” বলে মন্তব্য করার পর তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ করেই ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে।

বুধবার তেলের দামের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলারের আশপাশেই রয়েছে। সব মিলিয়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত।

এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী তেল বাজার স্থিতিশীল করার বিকল্প উপায় নিয়ে জি-৭ দেশগুলোর সাথে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ।

জি-৭ দেশগুলো জানিয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ মোকাবেলায় “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে প্রস্তুত তারা।

যদিও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে জ্বালানি সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম মজুদধারী দেশ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

এদিকে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রধান উৎপাদক কাতার, উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেলের চেয়েও এলএনজির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইউরোপ এবং এশিয়ার দেশগুলোতে যার প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। মার্চের শুরু থেকেই শিল্প কারখানায় ২০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ কমিয়েছে ভারত।

জ্বালানির দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় স্কুল বন্ধ ঘোষণা এবং সরকারি কর্মচারিদের জ্বালানি ভাতা কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তানও।

 

বিবিসি নিউজ বাংলা