যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি—যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, নাকি বিজয় ঘোষণা করে ধীরে ধীরে সরে আসা। দুটি পথের যেকোনোটি বেছে নিলেই গুরুতর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতির ঝুঁকি রয়েছে।
দুই সপ্তাহ আগে ট্রাম্প নিজেই এই যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যুদ্ধ যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে পরিস্থিতি তার প্রশাসন প্রথমে যতটা সহজ ভেবেছিল, বাস্তবে তা অনেক বেশি জটিল।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি
ইরান সামরিকভাবে দুর্বল হলেও এখনও উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের শাসক আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও নিহত হয়েছেন।
তবে এর পরেও ইরানের ক্ষমতাসীন ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। খামেনির আহত ছেলে এখন নেতৃত্বে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে ইরান তার অসম যুদ্ধ কৌশল—সাইবার হামলা, সমুদ্রপথে মাইন বসানো এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা—চালিয়ে যাবে।

এই অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে গেলে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি বাড়তে পারে, আর্থিক ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জোটেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ট্রাম্পের সমর্থক ঘাঁটির মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ তিনি আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন যুদ্ধে জড়াবেন না।
যুদ্ধ থেকে সরে আসার সমস্যাও কম নয়
যদি ট্রাম্প এখন যুদ্ধ থেকে সরে আসেন, তাহলে তার ঘোষিত প্রধান লক্ষ্যগুলোর অনেকই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল ইরানকে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থেকে পুরোপুরি বিরত রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কাছে এখনও প্রায় বোমা তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামের বড় মজুত রয়েছে। এটি ইসফাহানের গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত। এই মজুত যদি অক্ষত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ইরান দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোতে পারে।
এই উপাদান উদ্ধার করতে হলে মার্কিন বাহিনীকে স্থল অভিযান চালাতে হতে পারে—যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগই ইরানে। ইরানের জাতিসংঘ প্রতিনিধির মতে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৩৪৮ জন বেসামরিক নাগরিক।
অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরও ২৫০০ মেরিন সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর সংকট
ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়।
ইরান এই পথের জাহাজ চলাচল কার্যত অচল করে দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং পারস্য উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের বীমা খরচও বেড়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রিটেনকে নৌবাহিনী পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালী নিরাপদ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রকাশ্য আহ্বান।

সাইবার হামলা ও নতুন হুমকি
যুদ্ধ এখন কেবল সামরিক সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান তার সাইবার ইউনিট সক্রিয় করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা চালানো শুরু হয়েছে।
মার্কিন চিকিৎসা প্রযুক্তি কোম্পানি স্ট্রাইকারের সিস্টেম হ্যাক হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। একটি হ্যাকার গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করে বলেছে, এটি ইরানে একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও কয়েকটি সহিংস ঘটনার খবর এসেছে, যেগুলোকে এই যুদ্ধের প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতভেদ
যুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যেও কিছু মতভেদ দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে তেহরানের বড় তেল ডিপোতে হামলা না করার পরামর্শ দিয়েছিল, কারণ এতে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।
তবে ইসরায়েল সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে হামলা চালায়। এর ফলে বড় অগ্নিকাণ্ড হয় এবং তেলের দাম দ্রুত বাড়ে।

এরপর ইরান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনাগুলিতে ড্রোন হামলা চালায়।
যুদ্ধের পরবর্তী বড় সিদ্ধান্ত
আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্পকে দুটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
প্রথমটি হলো ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল করা। এটি সফল হলে ইরানের অর্থনীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে।
তবে দ্বীপটি দখল করলে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি রাখতে হতে পারে—যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হলো ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি ভাণ্ডার উদ্ধার করা। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান হতে পারে, কারণ গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় প্রবেশ করা এবং নিরাপদে উপাদান সরিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন।
ভুল হলে সেখানে তেজস্ক্রিয় ও বিষাক্ত বিপর্যয় ঘটতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধের প্রভাব বহু বছর ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে অনুভূত হবে।
ইরাকের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোশিয়ার জেবারি বলেছেন, খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটি যুগের সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু এতে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অবসান হবে—এমনটা নিশ্চিত নয়।
তার মতে, এই সংঘাত মূলত প্রযুক্তি ও আদর্শের যুদ্ধ। ইরান এখন কঠিন পরিস্থিতিতে থাকলেও তাদের জন্য এটি অস্তিত্বের লড়াই।
এদিকে ট্রাম্প বলেছেন, পারমাণবিক জ্বালানি দখলের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তার বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে এই যুদ্ধের সমাপ্তি এখনও অনেক দূরে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















