নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। এই রায়ের ফলে সংবিধানে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান ফিরে এসেছে এবং এটি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
গত বছরের ২০ নভেম্বর তাঁর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করে।
রায়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে দেয়া আগের আপিল বিভাগের রায়কে ত্রুটিপূর্ণ ও কলঙ্কিত বলে উল্লেখ করে তা বাতিল করা হয়েছে। আদালত মত দিয়েছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাস্তবে গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করেছে এবং সময়ের সঙ্গে এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া রায়ে বলা হয়েছে, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

আইনজীবীদের মতামত
আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, এই রায়ের ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান আবারও সংবিধানে ফিরে এসেছে। তাঁর মতে, যদি সংসদ এ বিষয়ে নতুন কোনো পরিবর্তন না আনে, তবে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের যেকোনো ধারা সংযোজন, বিয়োজন বা আধুনিকায়নের ক্ষমতা স্বাধীন ও সার্বভৌম সংসদের রয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুরুত্ব
আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট দূর করা।
আদালতের মতে, সংবিধান যে গণতান্ত্রিক শক্তিকে রক্ষা করতে চায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হওয়ায় সেই শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় এবং এটি গণতন্ত্রকে কার্যকরভাবে সুরক্ষা দেয়।
তবে ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের সময় এ ব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল বলে পর্যবেক্ষণ দেয় আদালত।

পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রভাব
রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এর ফলে ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনাই প্রায় বাতিল হয়ে যায়।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। আদালতের মতে, এটি শুধু সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পথ থেকে সরে যায়নি, বরং এমনভাবে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল যাতে ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায়ের মূল বক্তব্য কার্যকর হওয়ার আগেই তা অকার্যকর হয়ে পড়ে।
কখন থেকে কার্যকর হবে
আপিল বিভাগ জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হলেও তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হবে না। এটি কার্যকর হবে আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে।
অর্থাৎ বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের মেয়াদ শেষ হলে বা সংসদ আগেই ভেঙে গেলে সংবিধানের নির্ধারিত শর্ত পূরণ হবে এবং তখন থেকেই পুনর্বহাল হওয়া ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
আদালতের মতে, এতে ভবিষ্যতের নির্বাচনী ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

পরিবর্তনের সুযোগ
আইনজীবীদের মতে, বর্তমান সংসদ চাইলে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারে।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীর ধাঁচেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার ফিরেছে। তবে এখনকার কাঠামো অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন।
তিনি জানান, সংসদ যদি চায় যে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে অন্য কোনো ব্যক্তিকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই দায়িত্ব দেয়া হবে, তাহলে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে নতুন করে সংশোধনী আনতে হবে। তা না হলে আদালতের নির্ধারিত কাঠামোই অনুসরণ করতে হবে।
পটভূমি
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করা হয়।
১৯৯৮ সালে এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করা হয়। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট রিট খারিজ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করেন।

এর বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে।
পরে সংক্ষিপ্ত রায়ের প্রায় ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। তবে সংক্ষিপ্ত রায়ের পরই ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।
রিভিউ আবেদনের প্রক্রিয়া
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার পতনের প্রেক্ষাপটে সুশাসনের জন্য নাগরিক সংগঠনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে।
পরবর্তীতে বিএনপির মহাসচিব এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলও একই বিষয়ে রিভিউ আবেদন করেন। এছাড়া নওগাঁর রাণীনগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও আদালতের কাছে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান।
রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ আপিলের অনুমতি দেয়। এরপর দীর্ঘ শুনানি শেষে গত বছরের ২০ নভেম্বর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















