উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী প্রাণীদের মধ্যে যে বিশেষ জিনগত পরিবর্তন দেখা যায়, তা মানুষের স্নায়ু ক্ষতি মেরামতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে—এমনটাই জানিয়েছেন গবেষকরা। কম অক্সিজেনের পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এই অভিযোজন ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার মূল দিক
গবেষণায় দেখা গেছে, ইয়াক বা তিব্বতি হরিণের মতো প্রাণীদের শরীরে থাকা একটি জিনগত পরিবর্তন স্নায়ুর চারপাশে থাকা সুরক্ষামূলক স্তর ‘মায়েলিন’ পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে। এই মায়েলিন ক্ষতিগ্রস্ত হলে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা সেরিব্রাল প্যারালাইসিসের মতো রোগ দেখা দেয়।
গবেষক লিয়াং ঝাং জানান, প্রকৃতির বিবর্তন আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কঠিন পরিবেশে প্রাণীরা যেভাবে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে, তা থেকে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির ধারণা পাওয়া সম্ভব।
মায়েলিনের গুরুত্ব
মায়েলিন হলো মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের স্নায়ুতন্তুকে ঘিরে থাকা একটি সুরক্ষামূলক আবরণ, যা বৈদ্যুতিক সংকেত দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিবহনে সাহায্য করে। শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মের সময় বা তার আগে অক্সিজেনের অভাবে এই স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেরিব্রাল প্যারালাইসিস হতে পারে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে মায়েলিন ক্ষতি মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের প্রধান লক্ষণ। এছাড়া বার্ধক্যজনিত কারণে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে গেলে এই স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভাসকুলার ডিমেনশিয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
জিনগত পরিবর্তনের প্রভাব
পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, তিব্বত মালভূমির মতো উচ্চভূমিতে বসবাসকারী প্রাণীদের শরীরে ‘রেটস্যাট’ নামের একটি জিনে পরিবর্তন ঘটে, যা কম অক্সিজেনেও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এই বিষয়টি পরীক্ষা করতে বিজ্ঞানীরা নবজাতক ইঁদুরকে উচ্চভূমির মতো কম অক্সিজেন পরিবেশে রাখেন। যেসব ইঁদুরের শরীরে এই জিনগত পরিবর্তন ছিল, তারা শেখা, স্মৃতি ও সামাজিক আচরণে অন্যদের তুলনায় ভালো ফল দেখায়। তাদের মস্তিষ্কে মায়েলিনের পরিমাণও বেশি ছিল।
মেরামতের ক্ষমতা বৃদ্ধি
আরও পরীক্ষায় দেখা যায়, এই জিনগত পরিবর্তন ক্ষতিগ্রস্ত মায়েলিন দ্রুত ও সম্পূর্ণভাবে মেরামত করতে সহায়তা করে। এতে অলিগোডেনড্রোসাইট নামের কোষের সংখ্যা বাড়ে, যা মায়েলিন তৈরি করে।
গবেষণায় আরও জানা যায়, এই পরিবর্তনযুক্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে ভিটামিন এ থেকে তৈরি ‘এটিডিআর’ নামের একটি উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকে। এটি ভিটামিন এ-কে সক্রিয় রূপে রূপান্তর করে, যা অলিগোডেনড্রোসাইটের বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করে এবং মায়েলিন পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে।

চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা
যখন এই এটিডিআর উপাদান মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস সদৃশ রোগে আক্রান্ত ইঁদুরকে দেওয়া হয়, তখন তাদের রোগের তীব্রতা কমে এবং চলাফেরার ক্ষমতা উন্নত হয়।
গবেষকরা মনে করছেন, এটি স্নায়ু ক্ষতির চিকিৎসায় একটি নতুন দিক খুলে দিতে পারে। বর্তমানে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের চিকিৎসায় মূলত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দমন করা হয়, কিন্তু এই নতুন পদ্ধতিতে শরীরের স্বাভাবিক উপাদান ব্যবহার করে স্নায়ু মেরামতের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গবেষণার সহায়তা
এই গবেষণাটি চীনের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গবেষণা কর্মসূচির সহায়তায় সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং গবেষক তৈরির তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















