১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় এসেছিলেন দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিষ্ঠাতা জেমস উইলসন, ইংল্যান্ড থেকে তাকে বিশেষভাবে পাঠানো হয়েছিল, ভাষ্যমতে, “বিপর্যয়কর অব্যবস্থার মুহূর্তে” ভারতের অর্থনীতি ফিরিয়ে আনতে। তিনি ক্রাউন কলোনির প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন, আয়কর ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, তারপর তাঁর এপিটাফের ভাষায় “আবহাওয়া ও পরিশ্রমের সম্মিলিত ফলে” হঠাৎ মারা গিয়েছিলেন। উইলসনের সময় থেকে শহর হারিয়েছে রাজধানীর মর্যাদা (১৯১১ সালে দিল্লির কাছে), বাংলার অর্ধেক অঞ্চল (১৯৪৭ সালে দেশভাগে) এবং ইংরেজি নাম (২০০১ সালের ভাষিক উপনিবেশমুক্তিতে)। কিন্তু অর্জন করেছে একটি দাবি, ভারতের সবচেয়ে বাসযোগ্য মেগাসিটি হওয়ার দাবি।
সস্তায় জীবন, সংস্কৃতিতে এগিয়ে
দ্য ইকোনমিস্ট লিখছে, ভারতের বড় শহরগুলোর মধ্যে কলকাতায় বাসা ভাড়া ও ফ্ল্যাটের দাম সবচেয়ে কম, ভালো স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবার ফিও সবচেয়ে কম। শিল্প, সংগীত ও সাহিত্যের ঐতিহ্য শহরটিকে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানীর স্বঘোষিত মর্যাদা দিয়েছে, ধর্ম ও লিঙ্গের প্রশ্নেও এটি উদার। প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই শহর দিল্লির পর ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম। গণপরিবহন সস্তা, বৈচিত্র্যময় ও সম্প্রসারণশীল। উঁচু সড়কের নেটওয়ার্ক শহরের দূরের অংশগুলোকে যুক্ত করছে। বেঙ্গালুরুর মতো স্বর্ণমানের যানজট এখনও অনেক দূরে। ক্যাফের সঙ্গে যোগ হচ্ছে ফ্যাশনেবল ককটেল বার ও উচ্চমূল্যের রেস্তোরাঁ, নতুন উঁচু হোটেল ও অভিজাত ফ্ল্যাট আকাশরেখায় যোগ করছে মুম্বাই-ঘরানার চাকচিক্য। পুরনো বড় বাড়িগুলো সংস্কার করে বানানো হচ্ছে এয়ারবিএনবি। শহরের বেশিরভাগ উন্নতির কৃতিত্ব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, যিনি ২০১১ সাল থেকে ক্ষমতায়। আগের ৩৪ বছর কমিউনিস্টদের শাসনে রাজ্যটি শ্রম অসন্তোষ ও ব্যবসার প্রতি বৈরীভাবের জন্য কুখ্যাত ছিল।

উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের জন্য অনুপযোগী, অচলাবস্থার ছায়া
তবে বড় স্বপ্নের মানুষদের কাছে শহরটি কম আতিথ্যশীল। মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় উৎপাদনের অংশ ক্রমাগত কমছে। হোয়াইট-কলার চাকরি সামান্য। প্রতিভাবান তরুণ বাঙালিরা দলে দলে চলে যাচ্ছেন। অন্য রাজ্যের স্নাতকরা এখানে আসেন না। ভারতের বড় পাঁচ শহরের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সবচেয়ে ধীর। লন্ডনে সরাসরি ফ্লাইট না থাকা শহরের অ্যাংলোফাইল উচ্চবিত্তের কাছে বিশেষভাবে কষ্টের। এক স্থানীয় বিশিষ্টজনের ভাষ্যমতে, মমতার অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি নেই, তার সরকার ব্যবসা নিরুৎসাহিত করে না, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের লাল গালিচা বিছিয়ে দেওয়া রাজ্যগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও নামে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে আসা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের অর্ধেকের বেশি গেছে মুম্বাইয়ের রাজ্য মহারাষ্ট্র ও বেঙ্গালুরুর কর্ণাটকে। পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছে ১ শতাংশেরও কম।
কলকাতা এখনও সমৃদ্ধ দেখালে তার কারণ পূর্ব ভারতের বিশাল ও বঞ্চিত অঞ্চলের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে এর ঐতিহাসিক অবস্থান। এটি উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রবেশের তোরণ, বিহার ও ঝাড়খণ্ডের মতো প্রতিবেশী রাজ্য থেকে অভিবাসীদের চুম্বক। মহামারি-পরবর্তী রিমোট ওয়ার্কের উত্থান কিছু হোয়াইট-কলার প্রবাসীকে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু সম্ভাবনার বিচারে কলকাতা এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতাগামী। ভোটার তালিকা সংস্কারে ৯০ লাখ নাম (প্রায় ১২ শতাংশ) বাদ পড়ায় এ মাসের নির্বাচনের ফল আরও অনিশ্চিত। উইলসন আজ কলকাতায় ফিরলে অবাক হয়েই দেখতেন শহরটি সত্যিই বাসযোগ্য, কিন্তু মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর তুলনায় তিনি হয়তো বুঝতেন, সেসব শহরের সমস্যাগুলো দ্রুত বৃদ্ধির লক্ষণ, আর কলকাতার মনোরমতা অচলাবস্থার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















