পশ্চিমবঙ্গের কয়লাখনি অধ্যুষিত রানিগঞ্জ অঞ্চলে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে খনির বিস্ফোরণের প্রভাব, বাড়িঘরের ক্ষতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা। দীর্ঘদিনের এই সমস্যাগুলো নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
জীবিকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কয়লা সংগ্রহ
রানিগঞ্জের নারায়ণকুড়ি গ্রামের অনেক বাসিন্দার দিন শুরু হয় ভোরের আগেই। তারা কাছের কয়লাখনিতে গিয়ে ছড়িয়ে থাকা কয়লা সংগ্রহ করেন, যা পরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন একটি বস্তা কয়লা জোগাড় করাই কঠিন, যা বিক্রি করে প্রায় ৩০০ টাকা পাওয়া যায়।
গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অন্ধকার ভোরে খনিতে যেতে হয়। এলাকায় অন্য কোনও কাজের সুযোগ নেই, কৃষিও হয় না, ফলে কয়লা সংগ্রহই একমাত্র আয়ের পথ।

খনির বিস্ফোরণে বাড়িঘর ধসে পড়ার অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা কল্পনা বাউরির অভিযোগ, খনিতে বিস্ফোরণের কারণে তার বাড়ি ধসে পড়েছে। তিনি জানান, প্রতিদিনের বিস্ফোরণে মাটির ঘর টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একদিন তার বাড়ি ও গোয়ালঘরের ছাদ ভেঙে পড়ে, এতে দুটি গরু মারা যায়। তিনি বেঁচে যান কারণ তখন বাড়িতে ছিলেন না।
গ্রামের অনেক বাড়িতেই ফাটল দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, এখন পর্যন্ত সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি।
ভোটের আগে রাজনৈতিক লড়াই তীব্র
রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র এলাকা পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোট হবে। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিজেপির অগ্নিমিত্রা পল তৃণমূল কংগ্রেসের সায়নী ঘোষকে পরাজিত করেছিলেন। এবার তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে দু’বারের বিধায়ক তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে মাঠে নামানো হয়েছে।
এলাকায় গত কয়েক বছরে শিল্প কার্যক্রমে মন্দা দেখা দিয়েছে। আগে কয়লাখনি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করলেও, বর্তমানে অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। ফলে বহু মানুষ অন্যত্র পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছেন, পাশাপাশি বেড়েছে অবৈধ কয়লা উত্তোলন।
![]()
ভূমিধস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
দীর্ঘদিনের খনন কার্যক্রমের ফলে মাটির নিচে ফাঁপা অংশ তৈরি হয়েছে, যা বাড়িঘরে ফাটল এবং কোথাও কোথাও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। পালপাড়া ও তিরাট গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ফাটল দেখা গেছে। খনির কয়লার ধুলায় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনেকেই অভিযোগ করেন, খনি চালুর সময় চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
দুই প্রধান দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
তৃণমূল প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকা কয়লা সংস্থা খনির ফাঁকা জায়গা পূরণের কাজ ঠিকমতো করছে না, যার ফলে ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, বিজেপির স্থানীয় নেতারা তৃণমূলের বিরুদ্ধে অবৈধ কয়লা ব্যবসা চালানোর অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, ভোট না দিলে স্থানীয়দের কয়লা সংগ্রহ করতে বাধা দেওয়া হয়।

কয়লা দুর্নীতি মামলা ও তদন্তের চাপ
পশ্চিমবঙ্গে বহুল আলোচিত কয়লা দুর্নীতি মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলো গত কয়েক বছর ধরে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি খনি থেকে অবৈধভাবে কয়লা উত্তোলন ও পাচার হয়েছে।
নির্বাচনের আগে এই মামলায় নতুন করে তৎপরতা বেড়েছে। একটি রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দপ্তরে অভিযান চালানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
তবে তৃণমূল এই তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















