পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল অঞ্চল আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে আবারও তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠতে চলেছে। আদিবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চল ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ, অতীতের উত্থান-পতন এবং বর্তমান ইস্যুগুলো নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জঙ্গলমহলের রাজনৈতিক পটভূমি
ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া—এই চারটি জেলা নিয়ে গঠিত জঙ্গলমহল একসময় বামেদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। পরে এটি মাওবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। ২০১১ সালের পর তৃণমূল কংগ্রেস এখানে প্রভাব বিস্তার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে সময়ের সঙ্গে বিজেপি এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে, বিশেষ করে আদিবাসী ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জনের মাধ্যমে।
ভোটের ফলাফল: পাল্টাপাল্টি দখল
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি জঙ্গলমহলে বড় সাফল্য পায়, ছয়টির মধ্যে পাঁচটি আসন জিতে নেয়। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪০টির মধ্যে ২৪টি আসন দখল করে, বিজেপি পায় ১৬টি।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আবার তৃণমূল তাদের অবস্থান আরও শক্ত করে চারটি আসন জেতে এবং অধিকাংশ বিধানসভা এলাকায় এগিয়ে থাকে।

ভোটার তালিকা সংশোধন ইস্যু
রাজ্যের অন্যান্য অংশে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জঙ্গলমহলে এর প্রভাব তুলনামূলক কম। অধিকাংশ কেন্দ্রে খুব সীমিত সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে, ফলে এটি এখানে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠেনি।
আদিবাসী ইস্যু ও রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ
প্রচারে বিজেপি রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে প্রটোকল ভঙ্গের অভিযোগ তুলে এটিকে আদিবাসীদের অপমান হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে তৃণমূল নেত্রী রাজ্যের আদিবাসীদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা তুলে ধরে এই অভিযোগ খারিজ করেছেন।
তৃণমূল আবার বিজেপির অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রতিশ্রুতি নিয়েও সমালোচনা করছে।
উন্নয়ন বনাম তোষণ বিতর্ক
বিজেপি এই নির্বাচনী লড়াইকে উন্নয়ন বনাম তোষণের লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের অভিযোগ, তৃণমূল আদিবাসীদের উপেক্ষা করেছে, জমি দখল করেছে এবং অঞ্চলটিকে দুর্নীতি ও অনুন্নয়নের চক্রে ফেলেছে।
তৃণমূল পাল্টা দাবি করছে, তারাই এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছে এবং মাওবাদী প্রভাব কমিয়েছে।

কুদমি ফ্যাক্টর: ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা
প্রায় ৫০ লক্ষ জনসংখ্যার কুদমি সম্প্রদায় পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ার বহু আসনে নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত। তারা নিজেদের তফসিলি উপজাতি মর্যাদা ও কুর্মালি ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে।
এই আন্দোলনের ফলে বারবার রেল ও সড়ক অবরোধ হয়েছে, যা রাজ্য রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে।
দাবি-দাওয়া ও রাজনৈতিক অবস্থান
২০২৪ সালে তৃণমূল কুদমি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২০২৫ সালে আবার আন্দোলন শুরু হয়।
বর্তমানে এই সম্প্রদায়ের একটি অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তৃণমূলের কৌশল ও দাবি
তৃণমূল তাদের প্রচারে জঙ্গলমহলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব তুলে ধরছে। মাওবাদী কার্যকলাপের পতনকে তারা নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে ভোটারদের আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
মোট চিত্র
সব মিলিয়ে জঙ্গলমহলে আদিবাসী ইস্যু, কুদমি সম্প্রদায়ের দাবি এবং উন্নয়ন বনাম তোষণের বিতর্ক—এই তিনটি বিষয়ই এবারের নির্বাচনে মূল ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে এই অঞ্চলই আবার পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















