জাপানের তোহোকু উপকূলের কাছে সোমবার ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, সমুদ্রের নিচে যে স্থানে এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল, সেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে এবং সেই চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
এই ভূমিকম্পের পর হোক্কাইদো থেকে চিবা পর্যন্ত সাতটি প্রিফেকচারের ১৮২টি নির্ধারিত এলাকায় ৮ বা তার বেশি মাত্রার আরও বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই সতর্কতা এক সপ্তাহ কার্যকর থাকবে, তবে সময়সীমা শেষ হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে—এমনটি নয়।
২০২২ সালে চালু হওয়া এই বিশেষ সতর্কতা জাপান আবহাওয়া সংস্থা মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো জারি করল। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সানরিকু উপকূলে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের পর প্রথমবার এটি দেওয়া হয়েছিল।
২০১১ সালের ভয়াবহ পূর্ব জাপান ভূমিকম্পের একই এলাকায় আবার বড় কম্পন কেন হলো—এই প্রশ্ন ঘিরেই এখন বিশ্লেষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভূমিকম্পের ধরন ও উৎপত্তি
এই ভূমিকম্পটি ছিল সাবডাকশন অঞ্চলের আন্তঃপ্লেট ভূমিকম্প। এমন ভূমিকম্প সাধারণত দুটি প্লেটের সীমানায় ঘটে, যেখানে সমুদ্রের প্লেট ধীরে ধীরে মহাদেশীয় প্লেটের নিচে ঢুকে যায়। এই প্রক্রিয়ায় মহাদেশীয় প্লেট বাঁকতে থাকে এবং দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি সঞ্চিত হয়।
একসময় এই চাপ হঠাৎ মুক্তি পায়, তখনই শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটে। জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের জাপান ট্রেঞ্চ ও চিশিমা ট্রেঞ্চ এলাকায় গত কয়েক দশকে বহু ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। সোমবারের ভূমিকম্পের প্রক্রিয়াও ২০১১ সালের বড় ভূমিকম্প ও গত ডিসেম্বরের ভূমিকম্পের মতোই বলে মনে করা হচ্ছে।
এটি কি ২০১১ সালের ভূমিকম্পের পরাঘাত?
তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পরিমাপ বিশেষজ্ঞ ফুমিআকি তোমিতা জানিয়েছেন, ২০১১ সালের ভূমিকম্পে যে শক্তি মুক্তি পেয়েছিল, তা কয়েক শতাব্দী ধরে জমা হয়েছিল। কিন্তু এবারের ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে ছোট এবং কয়েক দশকের জমে থাকা চাপ মুক্ত করেছে।
এ কারণে এটিকে সরাসরি ২০১১ সালের ভূমিকম্পের পরাঘাত বলা কঠিন। তবে এটি এমন একটি অঞ্চলে ঘটেছে, যেখানে বারবার শক্তি সঞ্চিত হয়ে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি হয়।

ডিসেম্বরের ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা
সোমবারের ভূমিকম্পের মাত্রা (মুহূর্ত মাত্রা ৭.৪) গত ডিসেম্বরের ভূমিকম্পের (৭.৫) কাছাকাছি। তবে দুই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল কিছুটা আলাদা। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি ইওয়াতে উপকূলের কাছে, আর ডিসেম্বরেরটি ছিল আউমোরি উপকূলের কাছে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা প্রথমে দ্রুত হিসাবের জন্য প্রাথমিক মাত্রা প্রকাশ করে, পরে আরও তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্ভুল মুহূর্ত মাত্রা নির্ধারণ করে।
এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ২০১১ সালের মূল ভূমিকম্পের পর ২০ মিনিটের মধ্যে হওয়া একটি পরাঘাতের এলাকার কাছাকাছি ছিল বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।
আরও বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা কতটা?
বিশ্বব্যাপী ১৯০৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৭ বা তার বেশি মাত্রার ১,৫২৯টি ভূমিকম্পের মধ্যে ১৯টি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের মধ্যে ৭.৮ বা তার বেশি মাত্রার আরও বড় ভূমিকম্প হয়েছে।
জাপানেও এমন ঘটনা অন্তত দুইবার ঘটেছে—১৯৬৩ ও ২০১১ সালে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বড় ভূমিকম্পের পরবর্তী সাত দিনে আরও বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১ শতাংশ, যেখানে সাধারণ সময়ে এই ঝুঁকি মাত্র ০.১ শতাংশ।
এই ১৯টি ঘটনার মধ্যে ১৬টি ভূমিকম্প প্রথম তিন দিনের মধ্যেই ঘটেছে, অর্থাৎ শুরুর দিনগুলোতে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।

সতর্ক থাকার পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূত্বকের নিচে চাপ এখনো রয়ে গেছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের কেন্দ্রের একটু উত্তরে। ওই এলাকায় ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল, যাতে তিনজন নিহত, ৭৮৮ জন আহত এবং ৯ হাজারের বেশি স্থাপনা আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও সেই সময়ের সুনামিতে বড় ক্ষতি হয়নি।
ফুমিআকি তোমিতা সতর্ক করে বলেছেন, “এবারের মতো বা এর চেয়েও বড় ভূমিকম্প আবারও হতে পারে—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















