দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত ও সীমিত যুদ্ধের নীতিতে অভ্যস্ত ইসরায়েল এখন এক ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। একাধিক ফ্রন্টে চলমান সংঘাত, দীর্ঘায়িত সামরিক অভিযান এবং স্পষ্ট লক্ষ্যহীন কৌশল দেশটিকে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও এই দীর্ঘ যুদ্ধগুলো কতটা কার্যকর, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
একাধিক ফ্রন্টে চাপের মুখে সেনাবাহিনী
বর্তমানে গাজা, দক্ষিণ লেবানন, সিরিয়া ও পশ্চিম তীর—এই চারটি ভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। কোথাও নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন, কোথাও সরাসরি সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে সেনাবাহিনী চরম চাপের মুখে। একই সময়ে ইরানকে লক্ষ্য করে আকাশ হামলাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই দীর্ঘ সংঘাতগুলো সাময়িক কিছু সাফল্য আনলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হলেও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, বরং সীমান্তে হুমকি এখনো বিদ্যমান।

কৌশলগত লক্ষ্যহীনতা ও মানবিক সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় সমস্যা কেবল সামরিক নয়, কৌশলগতও। অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের ফলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। এতে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা বাড়ছে।
ইসরায়েলের পুরনো নীতিতে যুদ্ধ ছিল দ্রুত শেষ করার একটি মাধ্যম, যার লক্ষ্য ছিল শান্তিকালীন উন্নয়ন। কিন্তু এখনকার দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সেই দর্শন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত।
পূর্ণ বিজয়ের লক্ষ্য, বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাত
অক্টোবর ২০২৩ সালের হামলার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েল ‘পূর্ণ বিজয়’-এর লক্ষ্যে এগিয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। ফলে সীমিত ও বাস্তবসম্মত কৌশলগুলো উপেক্ষিত হয়েছে।
বিভিন্ন প্রস্তাব—যেমন গাজায় বিকল্প প্রশাসন গঠন—প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। একইভাবে লেবানন ও সিরিয়ায় সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমাধানের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে। একসময় যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রবণতা থাকলেও এখন তাকে ক্রমাগত সংঘাত বাড়ানোর দিকে ঝুঁকতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক চাপ ও ব্যক্তিগত দায় এড়ানোর প্রবণতাও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও আগের মতো স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারছেন না, যা নীতিনির্ধারণে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
নির্বাচন সামনে, কিন্তু বিকল্প কোথায়
আগামী নির্বাচনের আগে ইসরায়েলিদের সামনে বড় প্রশ্ন—দেশ কি এতগুলো যুদ্ধ একসঙ্গে চালিয়ে যেতে পারবে? যদিও জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পরিষ্কার বিতর্ক এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বিরোধী নেতারাও বিকল্প কৌশল দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন, ফলে রাজনৈতিক সমাধানের পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

ভবিষ্যতের পথ কোন দিকে
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং সীমিত লক্ষ্য নির্ধারণ, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং বাস্তবসম্মত নীতির দিকে ফিরে যাওয়াই হতে পারে ইসরায়েলের জন্য টেকসই পথ।
দীর্ঘ যুদ্ধ কেবল অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতিই বাড়ায় না, আন্তর্জাতিক সমর্থনও কমিয়ে দেয়। ফলে এখন প্রয়োজন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস এবং পুরনো বাস্তববাদী নীতিতে ফিরে যাওয়া।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















