০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

যুবকের কোলে চাদরে মোড়ানো শিশু- ছবির পেছনের ঘটনা যা জানা যাচ্ছে

হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার শিশুর ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে

(প্রতিবেদনের কিছু বর্ণনা পাঠকের মানসিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে)

ধুসর একটি চাদরে মোড়ানো ছোট একটি শিশু, তাকে কোলে নিয়ে ছুটে চলছেন একজন যুবক। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মহাখালী এলাকা থেকে তোলা এমনি একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যেটি দাগ কেটেছে অনেকের মনে।

ঢাকার মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে থেকে তোলা ওই ছবিতে চাদরে মোড়ানো যেই শিশুটির নিথর দেহ দেখা গেছে তার নাম মো. সাদমান।

তিন বছর বয়সি শিশুটি মঙ্গলবার হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে।

সেখান থেকে শিশুটির মরদেহ যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সেই ছবিটি তুলেছিলেন বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার।

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককেই সেই ছবিটি শেয়ার করতে দেখা যায়। ছবির বর্ণনায়ও অনেকে লিখেছেন- ‘সন্তানের লাশ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা’।

যদিও বিবিসি বাংলা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে যেই যুবকের কোলে শিশু সাদমানের মরদেহ ছিল তিনি তার বাবা নন।

হাসপাতাল থেকে মৃত ঘোষণার পর একজন আত্নীয় সাদমানকে নিয়ে যাচ্ছিল ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের বাসায়।

গত একমাসেরও বেশি সময় বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর উঠে আসছে। প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত হয়ে বা এই রোগের উপসর্গ নিয়ে অসংখ্য শিশু ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে। যে কারণে ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালসহ বেশ কিছু হাসপাতালে বিশেষ ইউনিটও চালু করেছে সরকার।

হাম বা সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।

মঙ্গলবার সকালে হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পর ওইদিন বিকেলেই সাদমানকে দাফন করা হয় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে।

পরদিন বুধবার বিকেলে যখন সাদমানের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার, তখন তারা যাচ্ছিলেন আজিমপুর কবরস্থানে একমাত্র ছেলের কবরটি দেখতে।

সাদমানের মৃত্যুর পর তার স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন

সাদমানের মৃত্যুর পর তার স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন

‘তখনও বুঝিনি আমার বাচ্চাটা আর নাই’

মো. সজীব ও আফরিন মীম দম্পতির একমাত্র শিশু সন্তান মো. সাদমান। থাকেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। মি. সজীব চাকরি করেন একটি কাপড়ের দোকানে।

মি. সজীব জানান, দিন দশেক আগে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয় সাদমান। অসুস্থ অবস্থায় গত ১২ই এপ্রিল তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ওষুধ দেওয়া হয়, করতে দেওয়া হয় কিছু টেস্টও।

“আমাদের ঢাকা মেডিকেল থেকে বলছিল যদি শরীরে র‍্যাশ ওঠে তাহলে যেন হাম ডেডিকেটেড হাসপাতাল ভর্তি করাই। আমাদের ঢাকা মেডিকেল থেকে সুপারিশপত্রও দেওয়া হইছিল। বুধবার রাতে শরীরে র‍্যাশ দেখা দেয়। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৬ই এপ্রিল) সাদমানরে মহাখালীর হামের হাসপাতালে ভর্তি করাই”।

দাফনের পরদিন বিকেলেই একমাত্র শিশু সন্তানের কবরটি দেখতে কামরাঙ্গীচর থেকে আজিমপুরে ছুটছিলেন মা আফরিন মীম।

তিনি জানান, মহাখালীর ডিএনসিসির হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর প্রথম তিনদিন সাদমানকে রাখা হয়েছিল তিন তলার ওয়ার্ডে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে গেলো রোববার স্থানান্তর করা হয় আইসিইউতে।

সাদমানের বাবা-মা দুই জনই বলছিলেন, গতকাল মঙ্গলবার সকালেই পরিস্থিতি আরো জটিল থাকে।

মি. সজীব বিবিসি বাংলাকে বলেন, “গতকাল সকালে আমি বাসায় ছিলাম। নয়টার দিকে সাদমানের আম্মু হাসপাতাল থেকে ফোন করে বলে একটু জলদি আসেন, অক্সিজেন মাস্ক লাগানোর পর বাচ্চাটা ছটফট করতেছে। তখন তাড়াতাড়ি বাসা থেকে বের হয়ে আসি”।

“আমি যখন হাসপাতালে এসে লিফটের কাছে দাঁড়াই, তখন আমার ছোট বোন বলে- জলদি যা, ও কান্না করতেছে। আমি দ্রুত গিয়ে দেখি আমার সাদমান শুয়ে আছে। আর ওর আম্মু আর নানী কান্না করতেছে। তখনও আমি বুঝি নাই আমার সাদমান আর নাই,” বলছিলেন সাদমানের বাবা।

আত্নীয় রাফির কোলে হামে মারা যাওয়া সাদমানের মরদেহ

আত্নীয় রাফির কোলে হামে মারা যাওয়া সাদমানের মরদেহ

তারপর কী হলো?

বাসা থেকে হাসপাতালে এসে একমাত্র শিশু সন্তানের নিথর শরীরটি দেখে মি. সজীব তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে ছেলেটি তার আর নেই।

সাদমানের মা আফরিন মীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ওর বাবা যখন এসে ছেলের এই অবস্থায় দেখে তখন ওরে জড়ায়ে ধরে এমন কান্না করতেছিল, এক পর্যায়ে আমার ছেলের মুখ থেকেই পানি বের হচ্ছিল”।

তিনি জানান, আইসিইউ বেডে সকাল দশটার দিকেই মারা যায় সাদমান। তখন সেখানে তাদের কিছু আত্নীয়-স্বজন আসতে শুরু করে।

দ্রুতই হাসপাতালে আসেন মীমের খালাতো বোনের মেয়ের স্বামী রেদোয়ান আহমেদ রাফি।

মি. রাফি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “১১টা কিংবা তার একটু আগে আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটার বাবা তখন বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিল। সে কারণে আমি দ্রুত বাচ্চাটাকে নিয়ে বের হইছিলাম। বের হওয়ার পর ব্রিজ দিয়ে (ফুট ওভার ব্রিজ) রাস্তা পার হইছি”।

মি. রাফি যখন সাদমানের মরদেহ মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতাল থেকে নিয়ে বের হচ্ছিলেন, তখন শিশুটির শরীর মোড়ানো ছিল একটি ধুসর রংয়ের চাদরে।

ঠিক তখন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার। তিনি এই শিশুটির মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময়কার কয়েকটি ছবি তুলেন এবং সেই ছবিগুলো প্রকাশিত হয় গতকাল মঙ্গলবারই।

মূলত সেই ছবিই ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে তা শেয়ার করে লিখেন- “হামে আক্রান্ত শিশুটি মারা যাওয়ার পর একটি অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া যায়নি”। অনেকে আবার লিখেন- “হামে মারা যাওয়া শিশুকে নিয়ে অভাগা এক পিতা”।

ছবিটি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকে অনেক রকম গল্প ছড়াতে থাকে গত দুই দিনে।

ছবির ফটোগ্রাফার মি. সরকার বিবিসি বাংলাকে জানান, তিনি হাসপাতালের ভেতর ঢুকেছিলেন অফিসের অ্যাসাইনমেন্টে। সেখানে হাম আক্রান্তদের নিয়ে বিভিন্ন ছবি তোলার এক পর্যায়ে হাসপাতালের বাইরে আসেন। তখন সেখানে তিনজন নারীকে কান্নারত অবস্থায় দৌড়াতে দেখেই ওই ঘটনাটি ফলো করেন।

মি. সরকার বলছিলেন, “হঠাৎ দেখি তিনজন মহিলা দৌড়াচ্ছে। না বুঝেই দৌড় দিলাম তাদের পেছনে। গিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক এক বাচ্চার মরদেহ নিয়ে যাচ্ছে। তাকে ফলো করতে করতে দৌড়ালাম। তিনি মেইন রাস্তায় গেলো। পরে ফুটওভারব্রিজ পার হয়ে একটা সিএনজি নিলো, গেলো কামরাঙ্গীচরে”।

সাদমানের আত্নীয় মি. রাফিও বিবিসি বাংলাকে জানান, তখন দুইজন ফটোগ্রাফার ছবি তুলেছেন এবং শিশুটি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। তবে তবে তখন সিএনজি খোঁজার ব্যস্ততায় তিনি খুব বেশি কিছু জানাতে পারেননি। যে কারণে ছড়িয়ে পড়া ছবির ক্যাপশনে অনেকে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

করোনাকালে মহাখালীতে এই হাসপাতালটি চালু হয়েছিল করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য

করোনাকালে মহাখালীতে এই হাসপাতালটি চালু হয়েছিল করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য

চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ

প্রায় ছয়দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর মঙ্গলবার সকালে মো. সাদমান মারা যাওয়ার পর তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও তোলা হয়।

শিশুটির মা আফরিন মীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ ভালো থাকলেও নার্সদের অবহেলা ছিল খুব বেশি। তারা খুব একটা কেয়ার করতো না”।

প্রায় একই রকম অভিযোগ করেছেন সাদমানের বাবা মো. সজীব। তিনি অভিযোগ করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঠিক চিকিৎসার অভাব ছিল।

মি. সজীব বলেন, “আমার ছেলের তীব্র জ্বর ছিল সব সময়। এই জ্বর নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যাথ্যাই ছিল না। তারা শুধু বলতো জ্বর যদি ১০০ ডিগ্রির বেশি হয়, তাহলে প্যারাসিটামল খাওয়ান, সাপোজিটার দেন। আমরা ডাক্তারকে বলছিলাম জ্বরটা কমছে না, আপনারা এটা নিয়ে কিছু একটা করেন। কিন্তু তারা কাজের কাজ করতে পারেনি”।

যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছিলেন। কিন্তু শিশুটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচাতে পারেনি।

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার বিবিসি বাংলাকে জানান, গত ১৬ই মার্চ থেকে ডিএনসিসির এই হাসপাতালের হামের জন্য বিশেষ ইউনিট চালু করা হয়। এ পর্যন্ত দুই হাজার ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছিল। যাদের মধ্যে মাত্র ১১জন মারা গেছে।

তিনি বলেন, “সাদমান ১৬ এপ্রিল থেকে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। যতদিন যাচ্ছিল চিকিৎসায় রেসপন্স করছিল না। সেখানে তাকে আমরা ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করাই। সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছি। কিন্তু তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এতই দুর্বল ছিল যে ইনফেকশন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না”।

“ইনফেকশন রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। নিউমোনিয়ার পেশেন্ট শকে চলে গিয়েছিল। তারপরও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি”, বলছিলেন মি. হায়দার।

শিশুটি হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর সেখান থেকে বাসায় নেওয়ার জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি এমন তথ্যও কেউ কেউ গত দুইদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ালেও এই তথ্যের সত্যতা নেই বলে সাদমানের পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উভয়েই জানিয়েছে বিবিসি বাংলাকে।

 

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

শোকের মাসের শেষ দিন: এবার বাঙালির বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন সাধারণের প্রাণে প্রাণে

যুবকের কোলে চাদরে মোড়ানো শিশু- ছবির পেছনের ঘটনা যা জানা যাচ্ছে

১০:৫৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

(প্রতিবেদনের কিছু বর্ণনা পাঠকের মানসিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে)

ধুসর একটি চাদরে মোড়ানো ছোট একটি শিশু, তাকে কোলে নিয়ে ছুটে চলছেন একজন যুবক। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মহাখালী এলাকা থেকে তোলা এমনি একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যেটি দাগ কেটেছে অনেকের মনে।

ঢাকার মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে থেকে তোলা ওই ছবিতে চাদরে মোড়ানো যেই শিশুটির নিথর দেহ দেখা গেছে তার নাম মো. সাদমান।

তিন বছর বয়সি শিশুটি মঙ্গলবার হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে।

সেখান থেকে শিশুটির মরদেহ যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সেই ছবিটি তুলেছিলেন বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার।

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককেই সেই ছবিটি শেয়ার করতে দেখা যায়। ছবির বর্ণনায়ও অনেকে লিখেছেন- ‘সন্তানের লাশ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা’।

যদিও বিবিসি বাংলা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে যেই যুবকের কোলে শিশু সাদমানের মরদেহ ছিল তিনি তার বাবা নন।

হাসপাতাল থেকে মৃত ঘোষণার পর একজন আত্নীয় সাদমানকে নিয়ে যাচ্ছিল ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের বাসায়।

গত একমাসেরও বেশি সময় বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর উঠে আসছে। প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত হয়ে বা এই রোগের উপসর্গ নিয়ে অসংখ্য শিশু ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে। যে কারণে ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালসহ বেশ কিছু হাসপাতালে বিশেষ ইউনিটও চালু করেছে সরকার।

হাম বা সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।

মঙ্গলবার সকালে হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পর ওইদিন বিকেলেই সাদমানকে দাফন করা হয় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে।

পরদিন বুধবার বিকেলে যখন সাদমানের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার, তখন তারা যাচ্ছিলেন আজিমপুর কবরস্থানে একমাত্র ছেলের কবরটি দেখতে।

সাদমানের মৃত্যুর পর তার স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন

সাদমানের মৃত্যুর পর তার স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন

‘তখনও বুঝিনি আমার বাচ্চাটা আর নাই’

মো. সজীব ও আফরিন মীম দম্পতির একমাত্র শিশু সন্তান মো. সাদমান। থাকেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। মি. সজীব চাকরি করেন একটি কাপড়ের দোকানে।

মি. সজীব জানান, দিন দশেক আগে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয় সাদমান। অসুস্থ অবস্থায় গত ১২ই এপ্রিল তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ওষুধ দেওয়া হয়, করতে দেওয়া হয় কিছু টেস্টও।

“আমাদের ঢাকা মেডিকেল থেকে বলছিল যদি শরীরে র‍্যাশ ওঠে তাহলে যেন হাম ডেডিকেটেড হাসপাতাল ভর্তি করাই। আমাদের ঢাকা মেডিকেল থেকে সুপারিশপত্রও দেওয়া হইছিল। বুধবার রাতে শরীরে র‍্যাশ দেখা দেয়। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৬ই এপ্রিল) সাদমানরে মহাখালীর হামের হাসপাতালে ভর্তি করাই”।

দাফনের পরদিন বিকেলেই একমাত্র শিশু সন্তানের কবরটি দেখতে কামরাঙ্গীচর থেকে আজিমপুরে ছুটছিলেন মা আফরিন মীম।

তিনি জানান, মহাখালীর ডিএনসিসির হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর প্রথম তিনদিন সাদমানকে রাখা হয়েছিল তিন তলার ওয়ার্ডে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে গেলো রোববার স্থানান্তর করা হয় আইসিইউতে।

সাদমানের বাবা-মা দুই জনই বলছিলেন, গতকাল মঙ্গলবার সকালেই পরিস্থিতি আরো জটিল থাকে।

মি. সজীব বিবিসি বাংলাকে বলেন, “গতকাল সকালে আমি বাসায় ছিলাম। নয়টার দিকে সাদমানের আম্মু হাসপাতাল থেকে ফোন করে বলে একটু জলদি আসেন, অক্সিজেন মাস্ক লাগানোর পর বাচ্চাটা ছটফট করতেছে। তখন তাড়াতাড়ি বাসা থেকে বের হয়ে আসি”।

“আমি যখন হাসপাতালে এসে লিফটের কাছে দাঁড়াই, তখন আমার ছোট বোন বলে- জলদি যা, ও কান্না করতেছে। আমি দ্রুত গিয়ে দেখি আমার সাদমান শুয়ে আছে। আর ওর আম্মু আর নানী কান্না করতেছে। তখনও আমি বুঝি নাই আমার সাদমান আর নাই,” বলছিলেন সাদমানের বাবা।

আত্নীয় রাফির কোলে হামে মারা যাওয়া সাদমানের মরদেহ

আত্নীয় রাফির কোলে হামে মারা যাওয়া সাদমানের মরদেহ

তারপর কী হলো?

বাসা থেকে হাসপাতালে এসে একমাত্র শিশু সন্তানের নিথর শরীরটি দেখে মি. সজীব তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে ছেলেটি তার আর নেই।

সাদমানের মা আফরিন মীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ওর বাবা যখন এসে ছেলের এই অবস্থায় দেখে তখন ওরে জড়ায়ে ধরে এমন কান্না করতেছিল, এক পর্যায়ে আমার ছেলের মুখ থেকেই পানি বের হচ্ছিল”।

তিনি জানান, আইসিইউ বেডে সকাল দশটার দিকেই মারা যায় সাদমান। তখন সেখানে তাদের কিছু আত্নীয়-স্বজন আসতে শুরু করে।

দ্রুতই হাসপাতালে আসেন মীমের খালাতো বোনের মেয়ের স্বামী রেদোয়ান আহমেদ রাফি।

মি. রাফি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “১১টা কিংবা তার একটু আগে আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটার বাবা তখন বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিল। সে কারণে আমি দ্রুত বাচ্চাটাকে নিয়ে বের হইছিলাম। বের হওয়ার পর ব্রিজ দিয়ে (ফুট ওভার ব্রিজ) রাস্তা পার হইছি”।

মি. রাফি যখন সাদমানের মরদেহ মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতাল থেকে নিয়ে বের হচ্ছিলেন, তখন শিশুটির শরীর মোড়ানো ছিল একটি ধুসর রংয়ের চাদরে।

ঠিক তখন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার। তিনি এই শিশুটির মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময়কার কয়েকটি ছবি তুলেন এবং সেই ছবিগুলো প্রকাশিত হয় গতকাল মঙ্গলবারই।

মূলত সেই ছবিই ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে তা শেয়ার করে লিখেন- “হামে আক্রান্ত শিশুটি মারা যাওয়ার পর একটি অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া যায়নি”। অনেকে আবার লিখেন- “হামে মারা যাওয়া শিশুকে নিয়ে অভাগা এক পিতা”।

ছবিটি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকে অনেক রকম গল্প ছড়াতে থাকে গত দুই দিনে।

ছবির ফটোগ্রাফার মি. সরকার বিবিসি বাংলাকে জানান, তিনি হাসপাতালের ভেতর ঢুকেছিলেন অফিসের অ্যাসাইনমেন্টে। সেখানে হাম আক্রান্তদের নিয়ে বিভিন্ন ছবি তোলার এক পর্যায়ে হাসপাতালের বাইরে আসেন। তখন সেখানে তিনজন নারীকে কান্নারত অবস্থায় দৌড়াতে দেখেই ওই ঘটনাটি ফলো করেন।

মি. সরকার বলছিলেন, “হঠাৎ দেখি তিনজন মহিলা দৌড়াচ্ছে। না বুঝেই দৌড় দিলাম তাদের পেছনে। গিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক এক বাচ্চার মরদেহ নিয়ে যাচ্ছে। তাকে ফলো করতে করতে দৌড়ালাম। তিনি মেইন রাস্তায় গেলো। পরে ফুটওভারব্রিজ পার হয়ে একটা সিএনজি নিলো, গেলো কামরাঙ্গীচরে”।

সাদমানের আত্নীয় মি. রাফিও বিবিসি বাংলাকে জানান, তখন দুইজন ফটোগ্রাফার ছবি তুলেছেন এবং শিশুটি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। তবে তবে তখন সিএনজি খোঁজার ব্যস্ততায় তিনি খুব বেশি কিছু জানাতে পারেননি। যে কারণে ছড়িয়ে পড়া ছবির ক্যাপশনে অনেকে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

করোনাকালে মহাখালীতে এই হাসপাতালটি চালু হয়েছিল করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য

করোনাকালে মহাখালীতে এই হাসপাতালটি চালু হয়েছিল করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য

চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ

প্রায় ছয়দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর মঙ্গলবার সকালে মো. সাদমান মারা যাওয়ার পর তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও তোলা হয়।

শিশুটির মা আফরিন মীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ ভালো থাকলেও নার্সদের অবহেলা ছিল খুব বেশি। তারা খুব একটা কেয়ার করতো না”।

প্রায় একই রকম অভিযোগ করেছেন সাদমানের বাবা মো. সজীব। তিনি অভিযোগ করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঠিক চিকিৎসার অভাব ছিল।

মি. সজীব বলেন, “আমার ছেলের তীব্র জ্বর ছিল সব সময়। এই জ্বর নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যাথ্যাই ছিল না। তারা শুধু বলতো জ্বর যদি ১০০ ডিগ্রির বেশি হয়, তাহলে প্যারাসিটামল খাওয়ান, সাপোজিটার দেন। আমরা ডাক্তারকে বলছিলাম জ্বরটা কমছে না, আপনারা এটা নিয়ে কিছু একটা করেন। কিন্তু তারা কাজের কাজ করতে পারেনি”।

যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছিলেন। কিন্তু শিশুটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচাতে পারেনি।

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার বিবিসি বাংলাকে জানান, গত ১৬ই মার্চ থেকে ডিএনসিসির এই হাসপাতালের হামের জন্য বিশেষ ইউনিট চালু করা হয়। এ পর্যন্ত দুই হাজার ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছিল। যাদের মধ্যে মাত্র ১১জন মারা গেছে।

তিনি বলেন, “সাদমান ১৬ এপ্রিল থেকে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। যতদিন যাচ্ছিল চিকিৎসায় রেসপন্স করছিল না। সেখানে তাকে আমরা ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করাই। সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছি। কিন্তু তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এতই দুর্বল ছিল যে ইনফেকশন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না”।

“ইনফেকশন রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। নিউমোনিয়ার পেশেন্ট শকে চলে গিয়েছিল। তারপরও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি”, বলছিলেন মি. হায়দার।

শিশুটি হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর সেখান থেকে বাসায় নেওয়ার জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি এমন তথ্যও কেউ কেউ গত দুইদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ালেও এই তথ্যের সত্যতা নেই বলে সাদমানের পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উভয়েই জানিয়েছে বিবিসি বাংলাকে।

 

বিবিসি নিউজ বাংলা