চীনে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এমন এক নতুন ব্যবসায়িক ধারা, যেখানে একজন উদ্যোক্তাই একটি পুরো কোম্পানি পরিচালনা করছেন—আর বেশিরভাগ কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। কর্মক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বৈষম্যের আশঙ্কা এবং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে তরুণদের মধ্যে এই ‘ওয়ান-পারসন কোম্পানি’ বা একক উদ্যোক্তা মডেল বিস্তার লাভ করছে।
এআই যুগে নতুন ব্যবসার বাস্তবতা
সাংহাইভিত্তিক ‘সোলোনেস্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা কারেন দাই মনে করেন, এই মডেল মূলত এআই যুগের ফল। আগে একা একটি ব্যবসা চালানো কঠিন ছিল, কিন্তু এখন এআই বিভিন্ন কাজ সহজ করে দেওয়ায় প্রবেশের বাধা অনেকটাই কমে গেছে। তিনি নিয়মিতভাবে একক উদ্যোক্তাদের জন্য কর্মশালা আয়োজন করেন, যেখানে তরুণরা নিজেরাই ব্যবসা শুরু করার ধারণা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।
একটি এমনই আয়োজনে দেখা গেছে, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় ২০ জন তরুণ একত্র হয়ে নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছেন। তাদের অনেকেই চাকরি ছেড়ে নিজস্ব পথে হাঁটার চেষ্টা করছেন।

এআই-নির্ভর আয়ের নতুন দিগন্ত
এই নতুন ধারা শুধু ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বাস্তব আয়ও তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে, ২৬ বছর বয়সী ওয়াং তিয়ানই নামের এক তরুণ এআই দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন বানিয়ে মাসে প্রায় ৪০ হাজার ইউয়ান আয় করছেন। ২০২৫ সালে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি ছেড়ে তিনি এখন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছেন।
তার মতে, এআই ব্যবহারের ফলে একক উদ্যোক্তারা দক্ষতার দিক থেকে এগিয়ে থাকছেন এবং ভবিষ্যতে এই ধারা আরও বিস্তৃত হবে।
‘৩৫-এর অভিশাপ’ ও চাকরির অনিশ্চয়তা
চীনে দীর্ঘদিন ধরেই ‘৩৫-এর অভিশাপ’ নামে পরিচিত একটি প্রবণতা রয়েছে, যেখানে ৩৫ বছর পেরোলেই অনেক কর্মীকে অযোগ্য হিসেবে দেখা হয়। এই বাস্তবতা অনেক তরুণকে আগে থেকেই বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করছে।
৩৪ বছর বয়সী ওয়েই শিন বুঝতে পেরেছিলেন যে তার ডকুমেন্ট রিভিউয়ের চাকরিটি একসময় এআই দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে। তাই আগেভাগেই তিনি এআই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজস্ব ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির পথে হাঁটেন। তার মতে, এআই নিয়ে একধরনের উদ্বেগ কাজ করছে—যদি এটি ব্যবহার না করা হয়, তবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সরকারি সহায়তা ও নীতিগত উৎসাহ
চীনের বিভিন্ন শহরও এই নতুন উদ্যোক্তা মডেলকে উৎসাহ দিচ্ছে। সুঝো শহর ২০২৮ সালের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি এআই-নির্ভর একক উদ্যোক্তা তৈরি করার লক্ষ্য নিয়েছে এবং এ খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে চেংদু শহর স্নাতকদের জন্য ২০ হাজার ইউয়ান পর্যন্ত ভর্তুকি ঘোষণা করেছে, যাতে তারা এআইভিত্তিক ব্যবসা শুরু করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগগুলো একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা বাড়াতে সহায়ক, অন্যদিকে যুব বেকারত্ব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে চীনে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রতি ছয়জনের একজন বেকার।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
তবে এই মডেলের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একক উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাদের পণ্য বা সেবা বিক্রি করা এবং লাভজনক অবস্থায় পৌঁছানো।
তারপরও তরুণদের মধ্যে এই ধারা বাড়ছে, কারণ তারা নিজের নিয়ন্ত্রণে কাজ করার স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেকেই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে এআইভিত্তিক উদ্যোগে ঝুঁকছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















