বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়ছে অ্যান্টার্কটিকার পেঙ্গুইনদের জীবনে। কয়েক দশক ধরে বরফে ঢাকা এই অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সমুদ্রের বরফ কমে যাওয়ায় বদলে যাচ্ছে পেঙ্গুইনের আবাসস্থল, খাদ্য সংগ্রহ এবং বংশবিস্তার প্রক্রিয়া। জাপানি গবেষকদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, কিছু প্রজাতির পেঙ্গুইন টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে, আবার কিছু প্রজাতি নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সম্রাট পেঙ্গুইনের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা
অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে পরিচিত প্রজাতি সম্রাট পেঙ্গুইন সম্প্রতি বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় যুক্ত হয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান হারে বরফ গলতে থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে এদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্রাট পেঙ্গুইন তাদের ছানা বড় করে সমুদ্রের বরফের ওপর। কিন্তু বরফ দ্রুত গলে গেলে ছানারা পানিতে পড়ে মারা যেতে পারে অথবা মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে প্রজননের হার কমে যাচ্ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে পূর্ব ও পশ্চিম অ্যান্টার্কিকার বিভিন্ন এলাকায় সম্রাট পেঙ্গুইনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের ভিন্ন চিত্র
সব পেঙ্গুইনের অবস্থা এক নয়। জাপানের শোওয়া স্টেশনের আশপাশে থাকা অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের সংখ্যা গত ৪০ বছরে তিন গুণ বেড়েছে।
গবেষকদের ধারণা, আগে এই অঞ্চলে অতিরিক্ত বরফ থাকায় খাবারের জন্য সমুদ্রে যেতে তাদের অনেক দূর হাঁটতে হতো। এখন বরফ ভেঙে ছোট ছোট অংশে পরিণত হওয়ায় সমুদ্রে পৌঁছানো সহজ হয়েছে। ফলে খাবার সংগ্রহেও সুবিধা পাচ্ছে তারা।
তবে সব এলাকায় পরিস্থিতি এমন নয়। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের কিছু অঞ্চলে অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের সংখ্যা গত ৩০ বছরে প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। কারণ সেখানে বরফ কমে যাওয়ায় ক্রিল নামের ছোট সামুদ্রিক প্রাণীর পরিমাণও কমছে, যা পেঙ্গুইনের প্রধান খাদ্য।
সমুদ্রের নিচে পেঙ্গুইনের বিস্ময়কর জীবন
জাপানি গবেষকরা ছোট জিপিএস ও গভীরতা মাপার যন্ত্র ব্যবহার করে পেঙ্গুইনের চলাচল পর্যবেক্ষণ করছেন। এতে জানা গেছে, ডিম পাড়ার পর স্ত্রী পেঙ্গুইন খাবারের সন্ধানে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত সাঁতরে যায়। কয়েক সপ্তাহ পরে ফিরে এসে ছানার দায়িত্ব নেয়, তখন পুরুষ পেঙ্গুইন সমুদ্রে যায়।
:max_bytes(150000):strip_icc():focal(749x0:751x2)/emperor-penguin-022526-7179a86173f245ccbd0623715556822b.jpg)
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বরফের ফাটল পেঙ্গুইনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এসব ফাটল দিয়েই তারা পানিতে নামতে পারে এবং খাবারের সন্ধান পায়। বরফের অবস্থা বদলালে তাদের জীবনযাত্রাও বদলে যায়।
নতুন খাদ্যের সন্ধান
পেঙ্গুইনের শরীরে ছোট ক্যামেরা লাগিয়ে গবেষকরা সমুদ্রের নিচের আচরণও পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, তারা শুধু ক্রিল নয়, ছোট আকারের আরও কিছু সামুদ্রিক প্রাণীও খাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় পেঙ্গুইনরা নতুন খাদ্যের উৎস খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এটি তাদের টিকে থাকার কৌশলের অংশ হতে পারে।
জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন উদ্যোগ

জাপানের একটি থিম পার্কে সম্রাট পেঙ্গুইনের কৃত্রিম প্রজনন নিয়েও কাজ চলছে। দীর্ঘদিন ধরে একই জোড়া পেঙ্গুইনের মাধ্যমে বংশবিস্তার হওয়ায় জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই সমস্যা কাটাতে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে নতুন বংশধারা তৈরির চেষ্টা করছেন। যদিও এখনো সফলভাবে ছানা ফোটানো সম্ভব হয়নি, তবুও এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টার্কটিকার পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পেঙ্গুইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপরই এর প্রভাব পড়ছে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর এই অনন্য প্রাণীরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















