বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রা বদলাচ্ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ছে, ব্যয় কমানোর প্রবণতা বাড়ছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অ্যালকোহল শিল্পে। এক সময় যে শিল্পকে স্থিতিশীল ও লাভজনক মনে করা হতো, এখন সেই খাতেই দেখা দিয়েছে বড় ধাক্কা। বিয়ার, ওয়াইন ও মদ প্রস্তুতকারী বহু আন্তর্জাতিক কোম্পানি বিক্রি কমে যাওয়া, লোকসান ও বাজারমূল্য হ্রাসের চাপে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী অ্যালকোহল গ্রহণ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। অনেক মানুষ এখন নিয়মিত পান করার বদলে বিশেষ অনুষ্ঠান বা সীমিত সামাজিক আড্ডায় মদ্যপান করছেন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও আগের তুলনায় মদ্যপানের আগ্রহ কমে গেছে।
স্বাস্থ্য সচেতনতা বড় কারণ
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়ায় অ্যালকোহল থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন অনেকে। চিকিৎসা গবেষণায় ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে অ্যালকোহলের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও বদলেছে।

বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে “কম পান করা” বা “সম্পূর্ণ বিরতি” নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অনেকেই এখন শরীর ও মানসিক সুস্থতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর ফলে সামাজিকভাবে মদ্যপানের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসছে।
অর্থনৈতিক চাপেও কমছে বিক্রি
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতিও এই খাতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় মানুষ এখন অতিরিক্ত খরচ কমানোর চেষ্টা করছেন। ফলে অনেকের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে অ্যালকোহলজাত পানীয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবিত্ত ও তরুণ ক্রেতাদের মধ্যেই এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে বিক্রি কমে যাওয়া বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চীনে সবচেয়ে বড় ধস
বিশ্বের অন্যতম বড় অ্যালকোহল বাজার চীনে পরিস্থিতি আরও কঠিন। সরকারি অনুষ্ঠানে অ্যালকোহল ব্যবহারে কড়াকড়ি এবং বিলাসী খরচ কমানোর উদ্যোগের কারণে দেশটির ঐতিহ্যবাহী মদ প্রস্তুতকারীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও বিক্রি কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তবে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কিছু বাজারে এখনো কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
কোম্পানিগুলোর কাটছাঁট শুরু
বিক্রি কমে যাওয়ায় বিশ্বের বড় বড় অ্যালকোহল কোম্পানিগুলো খরচ কমানোর পথে হাঁটছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে, উৎপাদন কমাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান আবার অ্যালকোহলবিহীন পানীয় বা কম অ্যালকোহলযুক্ত বিকল্প পণ্যে জোর দিচ্ছে। কারণ সামাজিক আড্ডায় অংশ নিলেও অনেক ভোক্তা এখন স্বাস্থ্যকর বিকল্প খুঁজছেন।
বিশ্বের বড় কয়েকটি বিয়ার ও মদ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য গত কয়েক বছরে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অনেক ছোট ও মাঝারি কোম্পানি দেউলিয়াও হয়ে পড়েছে।
তরুণদের বদলে যাওয়া অভ্যাস
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন প্রজন্ম আগের মতো নিয়মিত মদ্যপানে আগ্রহী নয়। তারা ফিটনেস, মানসিক স্বাস্থ্য ও সচেতন জীবনযাপনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন কিংবা চাপ কমানোর জন্য অন্য বিকল্প বেছে নিচ্ছেন।
এ কারণে অ্যালকোহল শিল্প এখন নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল নতুন করে সাজাতে বাধ্য হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ভবিষ্যতেও এই পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















