যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নীতিগত সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবার চালুর পথ তৈরি হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তেলের দাম কত দ্রুত কমবে কিংবা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কতটা নিরাপদ হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই।
বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে কার্যত এই পথ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে পারস্য উপসাগরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে।
তেলের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি চাপ
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রণালি খুলে গেলেও জ্বালানি বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দরিদ্র দেশগুলোতে, যেখানে পরিবহন ব্যয় আগে থেকেই বেশি ছিল।
![]()
যুক্তরাষ্ট্রে রবিবার প্রতি গ্যালন জ্বালানির গড় মূল্য ৪ দশমিক ৫১ ডলারের ওপরে উঠে যায়। একই সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারেও জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে আস্থার সংকটও বড় একটি বিষয়। জাহাজ কোম্পানিগুলো তখনই আবার নিয়মিত চলাচল শুরু করবে, যখন তারা নিশ্চিত হবে যে যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তি স্থায়ী এবং জলপথ নিরাপদ।
মাইন অপসারণে লাগতে পারে মাসের পর মাস
প্রণালিতে ইরান মাইন পুঁতে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে পথ খুলে দিলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, মাইন অপসারণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন নৌ শক্তিকে প্রথমে মাইন অপসারণকারী জাহাজ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ওই অঞ্চলে পাঠাতে হবে। এরপর পুরো জলপথ নিরাপদ ঘোষণা করা সম্ভব হবে।

এ অবস্থায় বীমা কোম্পানিগুলোও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা চাইতে পারে। জাহাজকে নৌবাহিনীর পাহারায় চলতে হতে পারে, যা পরিবহন ব্যয় আরও বাড়াবে এবং পণ্য সরবরাহে দেরি তৈরি করবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, স্থিতিশীল রপ্তানি কার্যক্রম পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে অন্তত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
সমঝোতার পরও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক সামরিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, দেশটির এই প্রণালি পরিচালনার “আইনি অধিকার” রয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান ভবিষ্যতে প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের ওপর ফি আরোপ করতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান নতুন এই কৌশলকে অর্থ সংগ্রহের একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘ ছায়া
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি ইতোমধ্যেই কমে এসেছে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। অনেক সরকার ও প্রতিষ্ঠান নতুন করে বুঝতে পারছে, তেল সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
এ কারণে ভবিষ্যতে সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক যান এবং বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালি আবার খুললেও বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে না। সংঘাতের প্রভাব আরও কয়েক মাস আন্তর্জাতিক বাজারে অনুভূত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















