বিশ্বরাজনীতিতে ইতিহাস কখনও কেবল অতীতের বিষয় নয়; এটি প্রায়ই বর্তমানের ক্ষমতার লড়াইয়ের অস্ত্র হয়ে ওঠে। এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে আজ সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তরাধিকার, বিজয়ী ও পরাজিতের পরিচয়, এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক একসময় ইতিহাসবিদদের আলোচনার বিষয় ছিল, তা এখন কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠককে ঘিরে প্রকাশিত তথ্য সেই প্রবণতারই ইঙ্গিত দেয়। সেখানে জাপানের নিরাপত্তা নীতি এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ে চীনের আপত্তি নতুন কিছু নয়, কিন্তু এর পেছনের রাজনৈতিক যুক্তি গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং ক্রমশ এমন একটি বর্ণনা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যেখানে চীনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নির্মাতা এবং জাপানকে সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধ ও নৈতিকভাবে সংকুচিত অংশগ্রহণকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
জাপানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি বা নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারের উদ্যোগকে অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে দেখেন। অথচ টোকিওর দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া। গত এক দশকে চীনের সামরিক শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্ব চীন সাগরে বিতর্কিত এলাকাগুলোতে চীনা উপস্থিতি বেড়েছে, সামরিক মহড়া ও শক্তি প্রদর্শনও আরও ঘন ঘন হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাপান তার নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করবে, সেটিই স্বাভাবিক।
তবু বেইজিংয়ের বক্তব্যে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপিত হয় যেন জাপানের প্রতিটি প্রতিরক্ষা উদ্যোগ অতীতের সামরিকতাবাদের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত। এই যুক্তি কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক হলেও তা ইতিহাসের একটি নির্বাচিত পাঠের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কারণ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপানের নিরস্ত্রীকরণ ছিল একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রয়োজনের ফল, স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় কোনো আন্তর্জাতিক বিধান নয়। বিশ্বের নিরাপত্তা বাস্তবতা যেমন বদলেছে, তেমনি রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা চাহিদাও পরিবর্তিত হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন যে যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কথা প্রায়ই উল্লেখ করে, সেই ব্যবস্থার প্রধান প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা কাঠামোর অধিকাংশই গড়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্যোগে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, জোটভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মূল কাঠামো নির্মাণে চীনের ভূমিকা তখন সীমিত ছিল। ফলে আজ নিজেকে সেই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে তুলে ধরা রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না।
এখানে আরেকটি পরিবর্তনও লক্ষণীয়। চীনের পূর্ববর্তী নেতৃত্ব সাধারণত অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল এবং অতীতের বিরোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিল। তারা বুঝেছিল যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বর্তমান সময়ে ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। এখন ইতিহাস কেবল স্মৃতির বিষয় নয়; এটি কৌশলগত বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
অবশ্যই জাপানের অতীত নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ঔপনিবেশিক শাসন ও যুদ্ধকালীন আগ্রাসনের কারণে বহু দেশ ও জনগণ গভীর ক্ষতির শিকার হয়েছে। জাপান নিজেও বিভিন্ন সময়ে সেই দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু অতীতের ভুল স্বীকার করা আর বর্তমানের প্রতিটি নিরাপত্তা সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করা এক বিষয় নয়।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত সার্বভৌমত্ব, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি সম্মান। যদি কোনো রাষ্ট্র এই নীতিগুলো রক্ষা করে, তবে তার বর্তমান আচরণই মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। অন্যদিকে, ইতিহাসে বিজয়ী হওয়ার দাবি নিজে থেকে বর্তমান নীতিকে বৈধতা দেয় না।
এই কারণেই আজকের বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো না কে ১৯৪৫ সালে ইতিহাসের সঠিক পাশে ছিল। বরং প্রশ্ন হলো, বর্তমান বিশ্বে কোন রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নিয়ম, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখতে কাজ করছে। ইতিহাসের মর্যাদা সম্মানের বিষয় হতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বৈধতার একমাত্র উৎস নয়। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর বিচার হওয়া উচিত তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে, অতীতের পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
কেন মোরিয়াসু 


















