যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে অন্তত একজন লেবানিজ সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। নতুন এই সহিংসতা যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপরও চাপ বাড়িয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে নতুন হামলা
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি ড্রোন বিভিন্ন সড়ক ও স্থানে হামলা চালায়। লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, চলমান ইসরায়েলি হামলার মধ্যে তাদের এক সদস্য বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। একই সময়ে উপকূলীয় শহর টাইরের আশপাশেও গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীর মৃত্যু
সংঘাতের মধ্যে দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের একজন সার্বিয়ান সদস্য নিহত হয়েছেন। মর্টার হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও দুই শান্তিরক্ষী আহত হয়েছেন। চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত সাতজন শান্তিরক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির শর্ত কী?
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, ইসরায়েল ও লেবানন যৌথভাবে যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে, তাতে দক্ষিণ লেবাননে কয়েকটি পরীক্ষামূলক নিরাপত্তা অঞ্চল গঠনের কথা বলা হয়েছে। এসব এলাকা থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সরে যেতে হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহর সব সদস্য ও সামরিক উপস্থিতি সরিয়ে নিতে হবে এবং ওই অঞ্চলগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লেবাননের সেনাবাহিনীর হাতে দিতে হবে। যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে এসব শর্ত বাস্তবায়নের ওপর।
তবে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, দেশের সব রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষ সম্মত হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এটি কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম বলেছেন, আগ্রাসন চলতে থাকলে তাদের প্রতিরোধও অব্যাহত থাকবে।

ইরানের কঠোর সতর্কবার্তা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, বৈরুতে কোনো হামলা হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে পূর্ণমাত্রায় আবারও জ্বালিয়ে দিতে পারে। তার ভাষ্য, লেবাননের রাজধানীতে হামলার গুরুতর পরিণতি হবে এবং প্রয়োজন হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে এখন পর্যন্ত আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ হওয়া এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো ছাড়া নতুন আলোচনার পথে অগ্রসর হওয়া কঠিন।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছেই
গত মাসেও যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়েছিল, কিন্তু সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে দেশটিতে ৩,৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সীমান্তপারের হামলায় অন্তত ২৬ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। উত্তর ইসরায়েলের বহু বাসিন্দাকেও ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, একটি পূর্ণাঙ্গ সমঝোতার লক্ষ্য নিয়ে ২২ জুনের সপ্তাহে নতুন দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। তবে মাটির পরিস্থিতি এবং নতুন হামলার কারণে সেই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে তাদের বাহিনী আপাতত অবস্থান বজায় রাখবে এবং নিরাপত্তা অঞ্চলে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেছেন, প্রয়োজন হলে বৈরুতেও হামলার স্বাধীনতা ইসরায়েলের থাকবে।
গাজায়ও হামলা অব্যাহত
লেবাননের পাশাপাশি গাজাতেও সংঘাত থামেনি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। ফলে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও লেবাননে নতুন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হিজবুল্লাহ, ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন অঞ্চলের পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















