চীন একদিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য নিজেদের টেলিযোগাযোগ খাতের কিছু অংশ আরও উন্মুক্ত করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনা টেলিকম অপারেটরদের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের পথে এগোচ্ছে। এই বিপরীতমুখী অবস্থান বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও যোগাযোগ খাতে দুই দেশের নীতিগত পার্থক্যকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (এমআইআইটি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১৬৬টি বিদেশি বিনিয়োগসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে মূল্য সংযোজনভিত্তিক টেলিযোগাযোগ সেবা বা ভ্যালু-অ্যাডেড টেলিকমিউনিকেশনস সার্ভিসেস (ভিএএস) পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এসব লাইসেন্সের আওতায় ইন্টারনেট ডেটা সেন্টার, ইন্টারনেট অ্যাকসেস এবং তথ্যসেবা খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগে নতুন সুযোগ
চীনের এই পদক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও বিশ্লেষকদের মতে, দেশের টেলিকম বাজারে এর প্রভাব সীমিতই থাকবে। কারণ যেসব খাত উন্মুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোতে ইতোমধ্যেই তীব্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান।
চীন ধীরে ধীরে বিদেশি টেলিকম সেবা প্রদানকারীদের ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল করছে। আগে এসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৫০ শতাংশ। এখন পরীক্ষামূলক অঞ্চলগুলোতে সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বেইজিং, সাংহাই, হাইনান ও শেনজেনসহ কয়েকটি নির্ধারিত অঞ্চলে এই সুবিধা কার্যকর রয়েছে।
দেশীয় বাজারে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমদিয়ার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইয়াং গুয়াং মনে করেন, এই নীতিগত পরিবর্তন চীনের অভ্যন্তরীণ টেলিকম বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে না।
তার মতে, উন্মুক্ত করা খাতগুলো আগে থেকেই অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং নতুন সুযোগগুলোও নির্দিষ্ট পরীক্ষামূলক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে স্থানীয় অপারেটরদের অবস্থান মৌলিকভাবে বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে জার্মান শিল্পপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিমেন্স কিংবা ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা এয়ারবাসের মতো কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও দক্ষভাবে পরিচালনার সুযোগ পাবে।
ডিজিটাল রূপান্তরে সহায়তা
বিশ্লেষকদের মতে, ভিএএস লাইসেন্স পাওয়ার ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো চীনের ভেতরে নিজেদের ডেটা সেন্টার ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো স্থাপন করতে পারবে। এতে তাদের মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে এবং ডিজিটাল রূপান্তরের গতি বাড়বে।
চীনের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেও এই পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পর থেকেই দেশটি ধীরে ধীরে টেলিযোগাযোগ বাজার উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়লে চীনা ভোক্তারা আরও বৈচিত্র্যময় সেবা পাবেন এবং বাজারে প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ শক্তিশালী হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন
চীনের এই উন্মুক্ত নীতির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি চীনা টেলিকম কোম্পানিগুলোর ওপর আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) জানায়, তারা চীনা টেলিকম অপারেটরদের যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার পরিচালনার সুযোগ সীমিত বা নিষিদ্ধ করার বিষয় বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে মার্কিন নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে প্রযুক্তি ও যোগাযোগ খাতে নীতিগত দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে চীন বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়ানোর বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উদ্বেগের কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















